এরশাদনামা ৫
--------------------
এরশাদ Vs মেজর জেনারেল নুরুল ইসলাম শিশু
প্রেসিডেন্ট জিয়া হত্যাকান্ডের পর জেঃ এরশাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে
দাড়াই মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু।বিএনপি সংশ্লিষ্ট সকলের ভেতর কৃষি
মন্ত্রী মেজর জেনারেল শিশু ও ডঃ বি চৌধুরী ছিলেন এরশাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ও
পথের কাঁটা। জিয়ার বিশ্বস্ত সহযোগী এই দুজনকে সরিয়ে দিতে এরশাদ গ্রহণ করেন
কুচক্রী পলিসি।
দ্র: তখন পর্যন্ত বেগম জিয়া প্রেক্ষাপটে আসেন নি, আসার সম্ভবনা নিয়ে সেভাবে কোন কথাও ওঠেনি।
প্রখর বুদ্ধিমত্তা, মুক্তিযোদ্ধা, অমায়িক ব্যাবহারের গুণাগুণ সমৃদ্ধ
শিশুকে যে কোন সমস্যার সহজ সমাধানের কারিগর বলা হত। সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে
তাঁর ছিল উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। বিএনপি ও প্রশাসনের মুক্তিযোদ্ধা অংশ এবং দলের
তরুণ নেতা কর্মিরা একমত ছিল যে জিয়াউর রহমানের অবর্তমানে একমাত্র মেজর
জেনারেল শিশু রাজনৈতিক ভাবে তাঁর উত্তরসূরি হবার যোগ্যতা রাখেন।
কাজেই শিশুর দ্বারাই শহীদ জিয়ার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
সেনাবাহিনীতে শিশুর জনপ্রিয়তা থাকার কারণে বিএনপির প্রতি আর্মিদের সফট
কর্নার জিয়ার পরেও টিকে থাকে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহাম্মেদ ,কে এম
ওবাইদুর রহমান, কর্নেল আকবর সহ ৫৫-৬০ জন দলীয় এমপি ও দলের শুভানুধ্যায়ীরা
শিশুকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেবার ইচ্ছা পোষন করেছিলেন। উচ্চপদস্ত সরকারী
আমলারাও চাচ্ছিলেন বিএনপি শিশুকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করুক।
নূরুল
ইসলাম শিশুর প্রার্থীতার গুঞ্জনে প্রমোদ গুনলেন এরশাদ, যদি শিশুকে প্রতিহত
না করা যায় তাহলে ক্ষমতা দখলের সব সাধ , পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে সাথে সাথে
জিয়ার অসমাপ্ত কাজ সমূহ পুর্নতা পাবে এবং এরশাদের ক্ষমতা দখলের আশা
চিরদিনের মত তিরোহিত হবে।
এরশাদ মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল বয়বৃদ্ধ
সাত্তার প্রেসিডেন্ট হলে কিভাবে তাঁকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে
ক্ষমতার হাতবদল ঘটাবে। এ লক্ষে সাত্তারের সাথে শিশুর মনোমালিন্য বৃদ্ধি করা
ও সাত্তারের মন্ত্রী পরিষদে নিজের লোক ঢুকানোর পরিকল্পনা নেয় এরশাদ। এরশাদ
গোয়েন্দা রিপোর্টের নামে সাত্তারের কান ভারি করে যে শিশুর নেতৃত্বে
ওবায়েদ, মওদূদ, আকবর, এস এ বারী দল পাকাচ্ছে যাতে সাত্তার মনোনয়ন না পান।
এরশাদ আরো জানায় যেহেতু ইয়াং বিএনপি সবাই শিশুর পক্ষে, ভাষানি ন্যাপ থেকে
আসা এমপি এরা সবাই শিশুর পক্ষে তাই যদি ওবায়েদ, মওদূদ, আকবর, এস এ বারী,
সাইফুর রহমান, হাবিবুল্লাহ খান ও ক্যাপ্টেন নূরুল হককে মন্ত্রী পরিষদ থেকে
অব্যাহতি না দেওয়া হয় তবে সাত্তারের আবার প্রেসিডেন্ট হবার সম্ভবনা
শুন্য।তাছাড়া সাত্তার মনোনীত উপরাষ্ট্রপতি হবার কারণে Office of profit
নিয়ে প্রার্থী হবার যোগ্য নন । অতএব সংবিধানের ৬ষ্ট সংশোধনীর মাধ্যমে
প্রার্থী পদ বৈধ করতে হবে।
সে কারণে শিশু ও তাঁর পক্ষের লোকদের
মন্ত্রী পরিষদ থেকে অব্যাহতি দিলে তাঁদের মনোবল ভেঙে যাবে এবং অন্যরা ৬ষ্ট
সংশোধনীর বিরুদ্ধে কোন কথা বলার সাহস পাবেনা।
এই যড়যন্ত্র
বাস্তবায়নে এরশাদের সাথে হাত মেলান তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শাহ্ আজিজুর
রহমান, শামসূল হূদা চৌধুরী, ডাঃ এম এ মতিন, মাইদুল ইসলাম মুকুল,
ব্যারিস্টার হাসনাত প্রমুখ। এরা সকলে মিলে সাত্তার কে বুঝাতে সক্ষম হয় যে
যদি সাত্তার প্রেসিডেন্ট হতে চাই তবে শিশু ও তাঁর বিশ্বস্ত লোকদের মন্ত্রী
সভা থেকে বিদায় করতে হবে।
অবশেষে সাত্তার নিজের কফিনে শেষ পেরেক
ঠুকতে ২০ জুন ১৯৮১ তে কৃষি মন্ত্রী মেজর জেনারেল শিশু এবং কর্নেল আকবরকে
মন্ত্রীসভা থেকে বহিষ্কার করে দেয়।
ফলশ্রুতিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ
কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসে এবং সেনাবাহিনী , প্রশাসন ও দলের ইয়াং জেনারেশনের
ভেতর তীব্র প্রতিকৃয়া দেখা দেয়।
এরশাদ ও শাহ্ আজিজ চেয়েছিল
মন্ত্রীসভা থেকে শিশুদের বিদায় করে দিয়ে সাত্তারকে একা করে দেওয়া দেওয়া
যাতে সাত্তার তাঁদের ওপর আরো নির্ভরশীল হয়ে পরলে তাঁদের পরিকল্পনা
বাস্তবায়ন সহজ হয়।
এরশাদ এই সময় প্রায় প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেন এবং নিজেকে জনপ্রিয় করার মত কথা বার্তা বলতেন।
সাত্তারকে বন্ধুহীন ও একা করে, এরশাদ ও শাহ্ আজিজের ওপর নির্ভরশীল করতে চাওয়ার পেছনে এরশাদের লক্ষ ছিল সুদুর প্রসারী।
ধূর্ত এরশাদের প্রথম পছন্দ ছিল বিচারপতি সাত্তার কে কনভিন্স করে উপ
রাষ্ট্রপতির পদ টি বাগিয়ে নেওয়া যাতে সাত্তারকে শারীরিক ভাবে অক্ষম ঘোষনা
দেওয়ানোর মাধ্যমে পুরো বিএনপিকে হাইজ্যাক করে নিজেকে প্রেসিডেন্ট পদে
আপগ্রেড করা।
দ্বিতীয়ত যদি সাত্তার নিজেকে অসুস্থ হিসাবে ঘোষনা দিতে
অস্বীকৃতি জানান সে ক্ষেত্রে আরো আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে সময়
সুযোগ মত সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সাত্তারকে সরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতাতে
আসীন হওয়া।
বিচারপতি সাত্তার যদি সেনাপ্রধান এরশাদের পাতা ফাঁদে পা
না দিয়ে মেজর জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশুর সাথে বোঝাপারার মাধ্যমে একটা
সমঝোতাতে আসতেন , তবে ইতিহাসে ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের কথা হয়তো লেখা হতো
না ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন