মুক্তিযুদ্ধে লুটপাট, অপ্রিয় সালতামামী
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~বিবরণ ১
~~~~~~একজন জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য ও স্বাধীনতার প্রথম দশক। লেখক মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব) বীরবিক্রম
১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১
*
সকালেই স্টেডিয়াম থেকে দেখতে পাই শহরে প্রচুর লোক সমাগম। তাদের অনেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং গাড়ি করে ও পায়ে হেঁটে শহরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের দেখে মনে হয়নি গত ৯ মাসে তারা বৃষ্টিতে ভিজেছে বা রোদে ঘেমেছে। তাদের বেশভূষা, চলাচল ও আচারণে যুদ্ধের কোন ছাপ ছিল না।
*
দুপুরবেলা জিন্নাহ এভিনিউ (বংগ বন্ধু এভিনিউ) এ লুটপাট আরাম্ভ হয়। আমি ও আমার সৈনিকরা, স্টেডিয়াম থেকে তা প্রত্যক্ষ করলাম। কিন্তু ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় বাহিনীর হাতে থাকাতে আমাদের করনীয় ছিল না। পরে জানতে পারি নিউমার্কেট ও অন্যান্য কিছু গূরুত্বপূর্ন এলাকাতেও ঐ দিন লুটতরাজ চলে। এই লুটতরাজের জন্য অন্যদের সাথে ভারতীয় বাহিনীকেও দোষারোপ করা হয়।
*
ঢাকা স্টেডিয়ামে পৌঁছে দেখি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুজন স্টাফ আমার জন্য অপেক্ষারত। তারা ব্যাংক লুটের আশংকা ও নিরাপত্যার অভাব বোধ করছিলেন। আমি যেন ব্যাংকের পর্যাপ্ত নিরাপত্যার ব্যাবস্থা করি, সেই অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন তারা।
* অর্ডিন্যান্স ডিপোতে লক্ষ করি, সেখানকার রসদ সামগ্রী ও অন্যান্য স্টক ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য ১৯৭৭ সালে জুলাই মাসে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত IDS বুলেটিন থেকে জানা যায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী আত্মমর্পনের পরে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের অন্তত চারটি ডিভিশনের অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ও যানবাহন ভারতে নিয়ে যায়। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিবাদ করলে টোকেন হিসাবে কিছু পুরানো অস্ত্র ফেরত দেওয়া হয়।
*১৯৭২ সালের প্রথম দিকে,ঢাকা সেনানিবাসে গেটে একটি বেসামরিক ট্রাক কে আটক করা হয়। এই ট্রাকটি ভারতীয় বহরের সাথে ভারত যাচ্ছিল।
ট্রাক থেকে বাংলাদেশ থেকে লুটে নেওয়া সামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
উল্লেখ্য উক্ত ট্রাকটি বেসামরিক ছিল বিধায়, তল্লাস নেওয়া যায়। স্বাভাবিক কারনেই ভারতীয় সামরিক ট্রাক গুলোতে তল্লাশি নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
*এই ট্রাকের মালামাল ছিল ইন্ডিয়াব ব্রিগেডিয়ার মিশ্র'র। এই অভিযোগে আসামের কাছার জেলার সেনানিবাসে তার ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল হয়।
*তবে উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে যে এই ব্রিগেডিয়ার মিশ্র হচ্ছেন সেই গর্বিত সৈনিক যিনি মিত্রবাহিনীর পক্ষে প্রথম ঢাকাতে পা রাখেন ।
বিবরণ – ২ একজন স্বদেশী
~~~~~~~~~~~~~~~~~বাংলাদেশে ভারতীয় আরদালীদের লুন্ঠনের ব্যাপারে আজিজুল করিম Why such anti Indian feelings among Bangladeshi? শিরোনামে এক নিবন্ধে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত Magazine ‘অনিক’-এর রিপোর্টের উদ্ধৃতি থেকে জানাচ্ছেন
“ভারতীয় সৈন্যদের লুণ্ঠিত মালামালের মূল্য ছিল প্রায় ১শ’ কোটি মার্কিন ডলার।”
আজিজুল করিম আরো লেখেন :
“শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের শত শত মিল কারখানার যন্ত্রপাতি, ব্যাংক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যাল, ঘর-বাড়ির গৃহস্থালী জিনিসপত্র পর্যন্ত বাদ যায়নি লোভী ভারতীয় লুটেরাদের হাত থেকে। এসব সম্পদ ও দ্রব্যাদির তখনকার মূল্য ছিলো আনুমানিক ৯০ হাজার কোটি টাকা। শৌচাগারের বদনাগুলোও বাদ দেয়নি ভারতীয় লুটেরার দল। এছাড়াও যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যও লুট করে নিয়ে যায়। সত্য কথা বলতে গেলে কিসিঞ্জার এই সব জানার পরেই উপহাস করে Bottomless basket বলেছিলেন।“
“১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংশে ৩রা ডিসেম্বর ভারতীয় আরদালী বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তারা ১৬ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ জুড়ে নজির বিহীন লুটপাট চালিয়েছিলো। ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যদের ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ- যার মূল্য ওই সময় ছিলো ২৭ হাজার কোটি টাকা, তার সবই ভারতীয় আরদালী বাহিনী ১৫টি বিশাল জাহাজে করে বাংলাদেশ থেকে লুট করে নিয়ে যায়। অথচ সেই অস্ত্রের মালিকানা ছিলো পুরোপুরি বাংলাদেশের”
বিবরণ ৩ একজন প্রত্যক্ষদর্শী
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
Bangladesh Past and present গ্রন্থে সালাহউদ্দিন আহমদ লেখেন ইন্ডিয়ান আরদালীদের লুণ্ঠন নিয়ে :
“যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর ভারতীয় সৈন্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিক সময় অবস্থান করতে থাকায় ভারত সমালোচিত হতে থাকে। অভিযোগ করা হয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্রাক বহরে করে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে ভারত বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশালী রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এমন একটি আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় নীতির বিরুদ্ধে উত্তেজনা ও সংশয় সৃষ্টি হয়।”
Bangladesh Past and present এ সালাহউদ্দিন আহমদ আরো লেখেন :
“যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর ভারতীয় সৈন্যরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অধিক সময় অবস্থান করতে থাকায় ভারত সমালোচিত হতে থাকে। অভিযোগ করা হয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্রাক বহরে করে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জাম সরিয়ে নিয়ে যায়। ফলে ভারত বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশালী রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এমন একটি আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় নীতির বিরুদ্ধে উত্তেজনা ও সংশয় সৃষ্টি হয়।”
বিবরণ ৪ একজন মুক্তিযোদ্ধা
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
Raw & Bangladesh গ্রন্থে মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল আবেদিন লিখেছেন :
“পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় সৈন্যদের ব্যাপক লুটতরাজ দেখতে পেয়ে ভারতের প্রকৃত চেহারা আমার কাছে নগ্নভাবে ফুটে উঠে। ভারতীয় সৈন্যরা যা কিছু দেখতে পেতো তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো এবং সেগুলো ভারতে বহন করে নিয়ে যেতো। লুটতরাজ সহজতর করার জন্য তারা আমাদের শহর, শিল্প স্থাপনা, বন্দর, সেনানিবাস, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এমনকি আবাসিক এলাকায় কারফিউ জারি করে। তারা সিলিং ফ্যান থেকে শুরু করে সামরিক সাজসরঞ্জাম, তৈজষপত্র ও পানির ট্যাপ পর্যন্ত উঠিয়ে নিয়ে যায়। লুণ্ঠিত মালামাল ভারতে পরিবহনের জন্য হাজার হাজার সামরিক যান ব্যবহার করা হয়।”
তিনি আরো উল্লেখ করেন
“বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারত অর্থনৈতিক, সামরিক, কৌশলগত ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হয়েছে। এ কারণে দেশটি তার নিজের স্বার্থে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়, আমাদের স্বার্থে নয়।”
এখানে শুধু মাত্র বহুল আলোচিত বই, পুস্তক, ম্যাগাজিন যেখানে ইন্ডিয়ান লুটতন্ত্র নিয়ে লেখা হয়েছে তাঁর সামান্য নমুনা তুলে ধরলাম। অনলাইনে একটু চেষ্টা করলেই সফট কপি পেয়ে যাবেন।
পরিশেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা যুদ্ধকে যারা শুধুই প্রতিবেশী দেশের করুণা ধারা মনে করেন তাঁদের চরণে তাঁদেরই প্রিয় কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের দু চরণ নিবেদন করলুম, রবিদা আসলে এই শ্রেণীর চরিত্র চিন্তা ও মজ্জাগত ডিএনএ এক্কেবারে হুবুহ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন , তাই লিখেছিলেন
সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি
সহায়ক গ্রন্থ ও ব্যাক্তি
১) Raw & Bangladesh গ্রন্থ Written by Freedom Fighter Joinal Abedin
2) Shan shah – Activist and Blogger
3) Bangladesh Past and Present written by Salauddin Ahammed
4)Indian Magazine "অনিক" এ "Why such anti Indian feelings among Bangladeshi?" নামক প্রবন্ধ Written by Azizul Karim

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন