১৯৮১
বন্দর নগর চট্টগ্রামে বিএনপির তখন দুই
ভাগে বিভক্ত। এক অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উপ-প্রধান মন্ত্রী জামাল উদ্দিন
আহাম্মেদ , অন্য অংশের নেতৃত্বে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার সুলতান
আহাম্মেদ চৌধুরী।
২৬ মে ১৯৮১
রাষ্ট্রপতির ব্যাক্তিগত সচিব লেঃ
কর্নেল মাহাফুজের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট জিয়া নির্ধারিত রাজশাহী সফর বাতিল
করে ২৯ মে ১৯৮১ তে চট্টগ্রাম সফরের সিডিউল করলেন।
এই দিন বিকালে জেনারেল এরশাদ অনির্ধারিত সফরে চট্টগ্রাম পৌঁছেন জেনারেল আবুল মঞ্জুরের সাথে মিটিং করার জন্য। তবে সেনাবাহিনীর পরিদর্শন কর্মসূচীতে জানানো হয় "বাংলাদেশ মিলিটারি এ্যকাডেমি" পরির্দর্শনে যাচ্ছেন সেনা প্রধান, যদিও এই সফরে এরশাদ "বাংলাদেশ মিলিটারি এ্যকাডেমি" র ধারেকাছেও যান নি।
লেঃ কর্নেল শাজাহান( AA & QMG) উক্ত পরিদর্শন কর্মসূচী প্রচার করেন।
বাংলাদেশ মিলিটারি এ্যকাডেমি তে কমাড্যান্ট আ স ম ব্রিগেডিয়ার হান্নান
শাহ্ সারাদিন অপেক্ষা করেন সেনা প্রধানতে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য।
অন্যদিকে জেনারেল এরশাদ সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছেই জেনারেল মঞ্জুরের অফিসে
বেলা ১.৩০ মিনিট পর্যন্ত টানা বৈঠক করেন ১.৩০ এ লাঞ্চ ব্রেকে অফিসার্স মেসে
শুধুমাত্র লেঃ কর্নেল মতির সাথে লাঞ্চ সারেন।
এই লেঃ কর্নেল মতি ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এরশাদের অধীনে কাজ করেছিল।
![]() |
| জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল আবুল মঞ্জুর |
লাঞ্চের পর এরশাদ পুনরাই জেনারেল মঞ্জুরের সাথে মিটিং এ বসেন। টানা ৫টা
পর্যন্ত গোপন মিটিং সেরে এরশাদ সরাসরি পতেঙ্গা বিমান বন্দরের পথ ধরেন। জেঃ
মঞ্জুর এরশাদকে তাঁর লামম্পট্যের কারনে অপছন্দ করলেও , সবাইকে অবাক করে
এরশাসের সাথে একই স্টাফ কারে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত জেনারেল এরশাদকে পৌঁছে দেন।
তাদের এই মিটিং এ দ্বিতীয় কেও উপস্থিত না থাকার কারণে আলোচনার বিষয় বস্তু
অপ্রকাশিত থেকে যায়। তবে অভিজ্ঞ জনেরা বলেন জিয়ার ওপর জেনারেল মঞ্জুরকে
ক্ষুদ্ধ করার মূল কাজটি এইদিন এরশাদ করেছিলেন।
২৯ মে ১৯৮১
এই দিন প্রেসিডেন্ট জিয়া রাজনৈতিক বহর নিয়ে চট্টগ্রাম পৌঁছান । সেনা প্রধান এরশাদের নাম ছিল সফর সঙ্গী তালিকাতে।
এই দিন আরো একটি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা ছিল , প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম
পৌঁছানোর আগেই জেনারেল মঞ্জুরকে তাঁর কর্মস্থল ২৪ পদাতিক ডিভিশনের কামান্ড
থেকে সরিয়ে ডিফেন্স সার্ভিসেস এন্ড স্টাফ কলেজে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই বদলি জেনারেল মঞ্জুরেরে ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস করে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল।
এই বদলী আদেশের দুই বছর আগে মঞ্জুর ছিলেন চিফ অব জেনারেল স্টাফস, এবং
ডিফেন্স সার্ভিসেস এন্ড স্টাফ কলেজ, চিফ অব জেনারেল স্টাফস অফিসের অধিনে।
এবং এই বদলী আদেশের সময় চিফ অব জেনারেল স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল নুরুদ্দিন যিনি জেনারেল মঞ্জুরের ৩ বছরের জুনিয়র।
অর্থাৎ, ডিফেন্স সার্ভিসেস এন্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসাবে জয়েন
করলে জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে তাঁর তিন বছরের জুনিয়র চিফ অব জেনারেল স্টাফ
মেজর জেনারেল নুরুদ্দিনের অধীনস্থ হতে হতো।
খুব স্বভাবিক ভাবে জেনারেল মঞ্জুর এই বদলী আদেশে চরম অপমান বোধ করেন এবং ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ওপর।
ধুর্ত জেনারেল এরশাদ চাচ্ছিলেনই , যেন জেনারেল মঞ্জুরকে প্রেসিডেন্টের ক্ষেপিয়ে তোলা যায়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন বিমানে , তখন কাটা ঘায়ে নুনের শেষ ছিটা দেন
জেনারেল এরশাদ। ধুর্ত এরশাদ , জেনারেল মঞ্জুরকে ফোন করে বলেন যে
প্রেসিডেন্ট চাচ্ছেন , জেনারেল মঞ্জুর প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাতে
এয়ারপোর্টে বা সার্কিট হাউজে না আসেন।
বদলী আদেশের অপমানের সাথে সাক্ষাৎ না করার আদেশ । চূড়ান্ত ভাবে জেনারেল আবুল মঞ্জুর দিকবিদ্বিক জ্ঞান শূন্য হয়ে পরেন।
![]() |
| জেনারেল আবুল মঞ্জুর |
তিনি সাথে সাথে ফোন দেন প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিবকে এবং প্রেসিডেন্টের
সাথে কথা বলতে চান। কিন্তু সামরিক সচিব মঞ্জুরকে জানান যে তিনি ভিন্ন কাজে
ব্যাস্ত থাকার কারণে রাষ্ট্রপতির সাথে চট্টগ্রাম যাচ্ছেন না , মঞ্জুরকে
প্রেসিডেন্টের অভ্যর্থনাতে উপস্থিত না হতে প্রেসিডেন্টের আদেশ সম্পর্কে তিনি
কিছু শোনেন নি বলে জানান। জেনারেল মঞ্জুর তখন সামরিক সচিবের কাছে পরামর্শ
চাইলে সচিব বলেন প্রেসিডেন্ট যদি তাঁকে যেতে নিষেধ করেই থাকেন তবে তাঁর না
যাওয়াই শ্রেয়।
প্রটোকল অনুযায়ী তিন বাহিনীর প্রধান , সিনিয়র সরকারি আমলা ও জিওসি বিমান বন্দরের রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানাবার নিয়ম।
অন্য সকলে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে এয়ারপোর্টে এ উপস্থিত
থাকলেও জেনারেল মঞ্জুর প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাতে এলেন না। জিওসি জেনারেল
আবুল মঞ্জুরের দৃষ্টিকটু অনুপস্থিতি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে স্বাভাবিক ভাবেই
অসন্তুষ্ট করে তোলে।
একদিকে মিথ্যা তথ্যে জিয়ার স্নেহ ভাজন জেনারেল
মঞ্জুরের তীব্র অপমানবোধ অন্যদিকে ঘুণাক্ষরে কিছু না জেনে মঞ্জুরের অধিনায়ক
প্রেসিডেন্ট জিয়ার অসন্তুষ্টি ...
আর কিছুক্ষণ পরেই ঘটে যাবে ইতিহাসের দুই মহান জানবাজ যোদ্ধার জীবনাবসান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ একজন জঘন্য কীটের
বিষাক্ত বর্জ ব্যাতীত আর কিচ্ছু না। ইতিহাসের তামাটে মলাটে চরম ঘৃণিত
মানুষের তালিকাতে প্রথম দিকেই থাকবে হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ।
বহুরূপী এরশাদ
![]() |
| বহুরূপী এরশাদ |




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন