সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

শহীদ জিয়ার বিপ্লব – দ্বিতীয় পর্ব

শহীদ জিয়ার বিপ্লব – দ্বিতীয় 




কৃষি বিপ্লবের জন্য আধুনিক সেচ ব্যাবস্থা আর খাল খনন করেই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেন নি। কৃষকরা যাতে সময় মত ফসল বুনতে পারে এবং সার দিতে পারে তার জন্য কৃষি ঋনের ব্যাবস্থা করেন। নিজে ব্যাক্তিগত উদ্দেগ্যে ১৯৭৭ সালে কৃষকদের জন্য সরকার থেকে ১০০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেন। শুধু মঞ্জুর করাই না সে ঋন কৃষকরা আবেদন করার ঠিক ৪৮ ঘন্টার মাঝে ঠিক ভাবে পাচ্ছে কিনা তাও নিজে সরেজমিনে তদন্ত করতেন। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নিতেন। এর জন্য গ্রাম গঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকা ভ্রমন করতেন।

কৃষি ব্যাংকের সাবেক উপ- মহাব্যাবস্থাপক জনাব শরীফুল ইসলাম স্মৃতিচারন থেকে এব্যাপারে কিছু জানা যায়।

“১৯৮০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের কথা আমি তখন যশোর শাখার ব্যাবস্থাপক। সকাল ৯টা ৫ মিনিটে অফিসে বসে আছি, হঠাৎ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমার সামনে হাজির। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। স্ব শরীরে প্রেসিডেন্ট আমার সামনে। গত রাতে প্রেসিডেন্ট যশোর আসে নি আসলে আমি নিশ্চয় ই জানতাম কারন প্রশাষনের কর্তা ব্যাক্তিদের সাথে আমি ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমি নিশ্চয় ই স্বপ্ন দেখছি।
“কি ম্যানেজার সাহেব? বসতে বলবেন না?”
জিয়াউর রহমানের গুরু গম্ভীর স্বরে আমার চৈতন্য হল।

“জ্বি স্যার, জ্বি” আমি অনেকটা ঘোরা লাগা কন্ঠে বললাম। ব্যাংকের খোজ নিতে লাগলেন। কর্মকর্তা কর্মচারীদের ব্যাপারে খোজ নিলেন কথা বললেন। এরই মাঝে যশোর জেলার সব উর্ধতন কর্মচারীরা আমার ব্যাঙ্কে হাজির। সামনের কাউন্টারে ৩০/৩৫ জন কৃষক ব্যাংকে এসেছে ঋন নিতে। প্রেসিডেন্ট তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করলেন তাদের ঋন পেতে কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা?

সব্বাই সমস্বরে বলল না হচ্ছে না। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ধন্যবাদ মযানেজার সাহেব। এর পর উনি চেয়ার থেকে উঠে বের হয়ে গেলেন। আমি এক কাপ চাও খাওয়াতে পারলাম না। সেই শত কোটি টাকার কৃষি ঋন আজকে হাজার কোটি ছাড়িয়ে গেছে। দেশ আজকে খাদ্যে যে স্বয়ং সম্পূর্ন তার মুলে কিন্তু ওই বিশেষ কৃষি ঋন।

কৃষির উন্নত যন্ত্রপাতি তৈরী করার জন্য তেজগাওতে কৃষি ব্যাংক কে তিন একর জমি দান করেন। সেখানে তিনি কৃষি বিভাগে কর্মরত উদ্ভাবকদের উদ্ভাবিত যন্ত্রপাতির এক প্রদর্শনীও তিনি নিজে দেখেন। স্বৈরশাষক এরশাদ ক্ষমতায় এসে সে প্রকল্প বাতিল করে উক্ত জায়গা দখল নেন।

উত্তর বংগের রাজশাহী, নাটোর, চাপাই নবাবগঞ্জ, পাবনা জেলার বেশ কয়টি উপজেলায় ফসল বলতে গেলে হত ই না। কারন এসব এলাকা অন্যান্য এলাকা থেকে কিছুটা উচু ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া “বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্প” নামে একটি প্রকল্প নিজ উদ্দেগ্যে চালু করলেন। শুরুতে খোদ কৃষি মন্ত্রনালয়ের কর্তা ব্যাক্তিরা এই প্রকল্পের ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখান। অনেকেই একে রাজনৈতিক উচ্চভিলাষী প্রকল্প হিসাবে দেখেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়ার ব্যাক্তিগত উদ্দ্যেগে আর তত্ত্বাবধানে এই প্রকল্প আশার থেকেও বেশি সফলতা লাভ করে। বর্তমানে উত্তর বংগের প্রধান শষ্য ভান্ডার হল বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্প। শুধু শষ্য উৎপাদনই নয় এর পাশাপাশি নারকেল, সুপারী, আম, পেয়ারা সহ অসংখ্য ফলজ শষ্য বরেন্দ্র প্রকল্প কে ঐশ্বর্য মন্ডিত করে।
জিয়া তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প চালু করে ধানের পাশাপাশি গম চাষের দিকে মনোযোগ দেয় যেটা কৃষি মন্ত্রনালয়ের কর্তা ব্যাক্তিরা মোটেও রাজি ছিলেন না। কিন্তু এক রোখা বাস্তববাদী প্রেসিডেন্ট জিয়া উত্তরবংগে ব্যাপকভাবে গমের ফলন করিয়ে আর একবার তার দেশ প্রেম দেখিয়ে দেন। সারা দেশে এখন যে ব্যাপকভাবে গম চাষ হয় সেটা ওই জিয়ার অনেক টা ব্যাক্তিগত উদ্দেগের ফল।
প্রেসিডেন্ট জিয়া ইতিহাসের পাতা থেকে নজির টেনে বলেন এক সময় এদেশে ব্যাপকভাবে তুলা চাষ হত এখন কেন হচ্ছে না? তিনি পরীক্ষামুলকভাবে ময়মনসিংহের ভালুকা, গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় তুলা চাষের নির্দেশ দেন। সে পরীক্ষা সফল হলে রাজশাহী সহ বেশ কয়েক টি জায়গায় বানিজ্যিক ভাবে তুলা চাষ শুরু হয়। আজকের যে রাজশাহীর সিল্ক তার উৎস কি জানেন? ওই তুলা যে তুলা চাষ জিয়ার মস্তিস্ক প্রসূত।

সামান্য ২/৩ বছরের কর্মপ্রচেষ্টা দেশ কে কোথায় নিয়ে যায় তার প্রমান জিয়া হাতে হাতে দেখিয়ে দেন। যেখানে ১৯৭৩-৭৪ সালে ৩৫ লক্ষ্য ৬১ হাজার ৪৭২ একর জমি সেচের আওতায় ছিল ১৯৮০-৮১ অর্থ বছরে ১.২ গুন বৃদ্ধি পেয়ে ৪২ লক্ষ্য ৬৪ হাজার একরে উন্নীত হয়। ১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে ধান, গম, পাতের হেক্টর প্রতি উৎপাদন ছিল ১.১, ০.৯, ৬.১ মেট্রিক টন ১৯৮০-৮১ অর্থ বছরে ১.৩, ১.৮ আর ৭.৮ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়। তার আমলে আখের উৎপাদন অনেক বেড়ে গিয়েছিল যথাযথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে। চিনি উৎপাদন বেড়ে যায় ১.৬৫ গুন মানে ১ লক্ষ্য ৪৫ হাজার ২১০ মেট্রিক টন। 

তামাক চাষিদের সমস্যা নিজে শুনতেন আর সেমত ব্যাবস্থা নিতেন। ১৯৭৫ সালের পূর্বে এদেশে রাবার চাষ প্রায় হত ই না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম রাবার চাষ শুরু হয়, ১৯৭৮-৭৯ সালে দেশে দশ লাখ পাউন্ড কাচা রাবার উৎপাদন হয়। এখন দেশের চাহিদার প্রায় ৬০% রাবার ই দেশে উৎপন্ন হয়।
জিয়া যে শুধু খাদ্য শষ্য উৎপাদনেই নজর দিয়েছিলেন এমন না। গবাদি পশু প্রজননের দিকে নজর রেখেছিলেন। ১৯৭২ এর সূচক =১০০ ধরে ১৯৮০-৮১ অর্থ বছরে ধানের উৎপাদন সুচক বাড়ে ১৩৮, গমের = ১১৫৮, আখের = ১২০, শাক সব্জির = ১১৫, গবাদি পশু এবং হাস মুরগীর খামার = ১৫৮ আর বন সম্পদ = ১৫৮।
শহীদ জিয়ার খাদ্য বিপ্লবের আরো অনেক পরিসংখ্যান এবং উদাহরন দেয়া যায় তবে সে দিকে আমরা এখন যাব না এব্যাপারে আরো অনেক কিছু বিশ্লেষানের আছে। তবে খাদ্য বিপ্লব কিন্তু দেশ কে সত্যই উন্নয়নের সামনের কাতারে নিয়ে এসেছিল।

সাথে থাকুন পরের পর্বে বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ শিক্ষা বিপ্লব এর আলোচনা হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন