নাজিমুদ্দিন রোডের খাঁটি সোনা
ঐতিহাসিক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভুমি থেকে এই কারাগারের কুখ্যাতি/খ্যাতি শুরু। বাংলা ভাষার আন্দোলন শুরু হলে পাকি জান্তা আন্দোলন কারীদের ধরে নাজিমুদ্দিন রোডের এই কারাগারে আটক রেখে নির্যাতন করতো।
ভাষা আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ করে। যেমন গতকাল করা হয়।
এরপর সেনা শাসন বিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা, আগড়তলা ষড়যন্ত্র, ৭১, ৭৫, ৮৩-৯০ পর্যন্ত উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরব ও কলংকের ভাগীদার এই কারাগার।
১৯৬৬ সালের ৬ দফা শুরু হলে, এই কারাগারের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাই। ৬ দফার অন্যতম দফা ছিল শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতিঃ যা আজকের বাংলাদেশের সাথেও যায়।
৯ মে ১৯৬৬ঃ ৬ দফার অভিযোগে মুজিবকে ডিটেনসনে পাঠানো হয়। শুরুতে ক্যান্টঃ এ নেয়া হলেও পরবর্তিতে নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগার মুজিবকে ধারণ করে।
৬ দফা আন্দোলনের পথে প্রায় সকল দেশ প্রেমিক বীরকে ধারণ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। যেমনঃ-
শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, ষ্টুয়ার্ড মুজিবুর, LS সুলতানুদ্দিন আহাম্মেদ, LSCDI নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান CSP এই কারাগারে বন্দী ছিলেন।
FS মাহফিজ উল্লাহ, কর্পোরাল আব্বাস সামাদ, হাবিলদার দলীল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস CSP, ফজলুল হক FS, বিভুতি ভূষণ, ইলিয়াস মানিক, বিধান কৃষ্ণা সেন, সুবেদার রাজ্জাক, ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, রাজ্জাক FS, সার্জেন্ট জহুরুল হক
সহ আরো অজস্র নাম না জানা প্যাট্রিয়টদের গর্বিত স্থান হয়েছিল এখানে।
৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে আবার পাদপ্রদীপ জ্বলে ওঠে ঢাকা কারাগারে। কারা রক্ষীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজবন্দীরদের সাথে তথ্য সমন্বয় শুরু করে, চুড়ান্ত ভাবে কারাক্ষীরা এবং বন্দীদের অনেকে একযোগে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাগলা ঘন্টি বাজিয়ে সব কটি কয়েদখানার কপাট উন্মুক্ত করে দেয়।
ফলশ্রুতিতে পাক হানাদাররা কারাগারের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। তারা বাংগালীদের প্রহসনের বিচারে নির্যাতন করে এখানে পাঠিয়ে দিত।
৯ মাসের মাথায় দ্বিতীয় বারের মত আবারো পাগলা ঘন্টি বেজে ওঠে কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সেই তারিখ।
১৯৭৫ সালে শেখ হত্যার পর আওয়ামীলীগ সরকারের প্রেসিডেন্ট
খন্দকার মুস্তাকের নির্দেশে
এই কারাগারে বন্দী করা হয় চার জাতীয় নেতাকে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোসারর্ফ ক্যু করার পর এই মহান চার নেতাকে কারাগারের নিরাপত্যা হেফাজতে হত্যা করা হয়। খালেদ মোশারর্ফ ও খন্দকার মুস্তাক সরকার চার নেতার খুনিদের বিচার না করে নিরাপদে ব্যাংকক পাঠিয়ে দেয়।
বেংগল জেল কোডের অন্তরগত এই কারাগারটির মুগল সুবাদার ইব্রাহিম খান নিশ্ছিদ্র দূর্গ হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে দুর্গটি ঢাকার নায়েব নাজিমের আবাসস্থলে পরিণত হয়।
এরপর দখলদার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৮৮ সালে দুর্গের অভ্যন্তরে ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণ করার মাধ্যমে স্থাপণাটিকে কারাগারে রূপান্তর করে।
এখানে দু’টি জাদুঘর রয়েছে। এর একটি ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর,’ অপরটি ‘জাতীয় চার নেতার জাদুঘর’। ২০১৬ সালের ৫ নভেম্বর শেখ হাসিনা এই জাদুঘর দুটি পরিদর্শন করে। http://bit.ly/2EeqjPT অর্থাৎ এই কারাগারের বর্তমান হাল চিত্রে উনাদের ভালো ধারণা আছে।
এই কারাগার কুখ্যাত দেশদ্রোহী অপরাধী হিসাবে শেখ মুজিব, প্রধান মন্ত্রী তাজুদ্দিন আহাম্মেদ, প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলাম সহ অসংখ্য রাজবন্দীকে গ্রহণ করে তাদের মুক্তি দিয়েছিল খাঁটি আগুনে পুড়া সোনার পরিচয়ে।
তথ্য জানুনঃ http://bit.ly/2smE1dU
২৯ শে জুন ২০১৬ঃ পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের 'লাল দালান' জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ 'ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার' থেকে ৬ হাজার ৪০০ বন্দীকে সরিয়ে ফেলে ২২৮ বছরের পুরনো কারাগারটি বন্ধ ঘোষিত হয়।
পরিত্যাক্ত হবার পর এ পর্যন্ত একজন ব্যক্তিও এখানে কারাভোগ করেনি। কিন্তু পরিত্যাগের ২ বছর ৪ মাস ১০ দিন পর খালেদা জিয়াকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে এই পরিত্যক্ত কারাগারেই দেয়া হলো।
৮৫০০ বন্দী ও ৭৭৩ জন অর্থাৎ ৯২৭৩ জনের সাবেক এই ভূতুড়ে আবাস স্থলে সম্পূর্ণ একাকী একজন রাজনৈতিক বন্দী হিসাবে অবস্থান করছেন গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
কল্পনাতে এনে দেখুন তো ২২৮ বছরের জরাজীর্ণ পরিত্যাক্ত ভবনে অন্যায় শাস্তিতে একাকী বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন তিন তিন বারের নির্বচিত প্রধান মন্ত্রী, দুই বারের জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে এখানেই বন্দী রাখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত ভাবে ২৫,৩৭,৬৬৯ ভোট অর্জনকারী বেগম জিয়ার কাছাকাছি ভোট অর্জনকারী আর কেউ নেই।
না শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও কেউ নেই।
যারা ভাবছেন তাঁকে স্বাপদ সংকুল বাস অযোগ্য নির্বাসনে রেখে কাবু করবেন, তারা বাস্তব জীবনে বেগম জিয়ার দৃঢ়তা ও বলিষ্ঠতার কাছে ধরাসয়ী হবার প্রতিশোধের ব্যার্থ পথ ধরেছেন মাত্র।
এভাবে তাঁকে যত নির্যাতন করুক না কেন, বেগম জিয়ার ব্যক্তিত্বের পাশে তারা অতি ক্ষুদ্রই থেকে যাবে।
আর নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক মহত্য তো আছেই।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন