প্রথম পর্ব
ততদিনে সেই ভয়ংকরতম দিন দেখে ফেলেছে তাবৎ জাহান। যে সময়ের ধ্বংস যজ্ঞ দেখার জন্য মানুষের এত অপেক্ষা, এত অর্থনাশ - ছোট্ট বালক আর মোটা মানুষ দুজন মিলে বোকা বানিয়ে দিয়েছে বিক্রমশীল সূর্যদয়ের দেশটিকে। ৬ এবং ৯ অগাষ্ট লিটল বয় এবং ফ্যাটম্যান নামক পারমাণবিক বোমা দুটি ছুঁয়ে দিয়ে যায় হিরোসিমা ও নাগাসাকি শহরের মাটি। মূহুর্তের বিষ্ফোরণ বোমাদুটি তার আগামী ১০০ বছরের মুখবন্ধ লিখে ফেলে। লাখ মানব জীবনকে পংগু করে, লাখ জীবনের কোটি স্বপ্ন পায়ে পিষে ২য় বিশ্বযুদ্ধ তখন নিভু নিভু। হিরোসিমা নাগাসাকি'র নরক লীলার কদিন পর বাংকারে বসে আত্মহত্যা করলেন এডলফ হিটলার ও তার প্রেয়সী ইভা ব্রাউন। যুদ্ধ কেড়ে নিল এক দানবীয় যোদ্ধার, কোমল কুসুমের মত প্রস্ফুরিত ভালোবাসা, সেই প্রেমগাথা স্থান পেলনা রোমিও জুলিয়েট, রহিম বাদশা-রুপবাণ আর লাইলী-মজনু'র কাতারে!
মিত্রবাহিনীর হাতে নিজেকে সমর্পণ করে দিলেন প্রবল প্রতাপশালী জেনারেল, ইতালিয়ান সমর নায়ক বেনিট মুসেলিনি। সেদিন ছিল ১০ তারিখ। এর ৫ দিন পর শেষ বাঁশির সুরে সমাপ্ত হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। গোলা বারুদের ধুয়া কুণ্ডলী সরে গিয়ে তখন বেচে থাকার বাতাস বয়ে যায় বিশ্ব ব্রম্মান্ডের এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৃথিবী নামক গ্রহে।
জয়গান ও প্রশান্তির বাণীতে মুখরিত; শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে, অলিতে-গলিতে প্রস্তুত হচ্ছিল হাজারে হাজারে আলোর মিছিল। সেদিন থেকে মসজিদে আজানের সুর, মন্দিরে ঘন্টাধ্বনীতে বিমান আক্রমনের বিভিষিকাময় হুশিয়ারী সাইরেন বাজে নি। ট্রেঞ্জ গুলোতে সুদীর্ঘ পাচ বছর সহবাসের পর ভয়ার্ত মানুষের বিচ্ছেদের পালা শুরু হয়ে যায়। মোয়াজ্জিনের আজান, মন্দিরে পুজারীর গীতা পাঠে সেদিন সবার সাথে আস্বস্ত হয়েছিল ভারত বর্ষ-ও।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দুপুরবেলা, এই উপমহাদেশের অবিভক্ত বাংলার জনগণও সেদিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এ যুদ্ধে এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করে। শেষ বিকেলের স্বস্তির নিশ্বাসে মুসলমানরা মসজিদে মিলাদ দেয়, হিন্দুরা মন্দিরে পুজো দেয়, খৃষ্টানরা গির্জায় প্রার্থনা করে। জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে ফেলে।
বিশ্বের সর্বত্র যখন যুদ্ধ বনাম শান্তির সুবাতাস সমীকরণে বিভোড় ঠিক এমন বিরল সময়ে, জলপাইগুড়ির মজুমদার বাড়িতে ছিল টানটান উত্তেজনা, সাস্পেন্স, অনিশ্চয়তা ও আশংকার অনুভূতি। কি হতে যাচ্ছে আগামী এক মূহুর্তে!
সেদিন জলপাইগুড়ি জেলা শহরের নয়াবস্তির এক শান্ত নীড় মুজমদার বাড়ির উঠানে চিৎকার ভেসে আসে এক নবজন্মা শিশুর। পৃথিবীর বুকে সদ্যজাত শিশুর চিৎকারকে শুভবার্তা বলা হয়। মুজমদার বাড়ির উঠানে ভেসে আসা চিৎকারটিও তেমনি ছিল। যুদ্ধ ও শান্তির মিলন স্থলে ১৫ অগাষ্ট যে শিশুর জন্ম তাঁর কাঁধে একদিন শান্তি প্রতিষ্ঠার দায় এসে পড়বে এতো ভাবানার অতীত কিছু নয়! তবে কজনেই বা শেষ অবধি লড়াই করে টিকে থেকে শান্তি ও মঙ্গলের পতাকা বয়ে নেবার শক্তি ও সুকঠিন মানসিক দৃঢ়তার টাচ লাইন স্পর্ষ করতে পারে? আজ শৈশব পেড়িয়ে পোড় খাওয়া প্রায় বার্ধক্যে এসেও সেদিনের শিশুটির যুদ্ধ শেষ হয় নি।
কেউ বলবেন প্লিজ সেদিনের সদ্যজাত দুধে আলতা গায়ের রঙে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে আপনি প্রথম কবে দেখে ছিলেন? তার নাম পরিচয় বা কি?
সবাই যদি চাই তবে তাঁর জন্ম পরবর্তি বেড়ে ওঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত তথ্য নিয়ে গল্পটা বেঁচে যাবে।
ইনফোঃ
১)জলপাইগুড়ির জল হাওয়া
২) সাংবাদিক রুহুল আমিন
৩)ব্রাম্মন বাড়ির চিঠি
৪) স্বৈরাচার বিরোধী আন্দালন ও মূল ধারার নেতৃত্ব