যেভাবে নাগরিকত্ব পান গোলাম আযম
সংগ্রহ: দৈনিক মানবজমিন থেকে
:যেভাবে নাগরিকত্ব পান গোলাম আযম:
রাজনৈতিক নয়, আদালতের সিদ্ধান্তেই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন জামায়াতে
ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম। তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে
অযোগ্য ঘোষণার সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষিত হয়েছিল হাইকোর্টে। যে রায়ের
বিরুদ্ধে আপিল করেও হেরে যায় সরকার। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ
সরকারের আপিল খারিজ করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তৎকালীন
প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লিখেছিলেন মূল রায়। তার সঙ্গে একমত
পোষণ করেছিলেন বিচারপতি এটিএম আফজাল, বিচারপতি মোস্তফা কামাল এবং বিচারপতি
লতিফুর রহমান। তাদের প্রত্যেকেই পরে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। বাংলাদেশের
ইতিহাসের একটি আলোচিত অধ্যায়ে দৃষ্টি ফেরালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৭৩ সালের
১৮ই এপ্রিল এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে গোলাম আযমসহ ৩৯ ব্যক্তিকে বাংলাদেশের
নাগরিকত্বের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। সে তালিকায় গোলাম আযমের নাম ছিল তিন
নাম্বারে। সুপ্রিম কোর্টের রায় থেকে দেখা যায়, গোলাম আযম তার হলফনামায়
দাবি করেছেন তার দাদা ও পিতা এবং তিনি নিজে বাংলাদেশের ভূখণ্ডেই জন্মলাভ
করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন। ১৯৭১
সালের ২৫শে মার্চ তিনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অধিবাসী ছিলেন।
২২শে
নভেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি এ ভূখণ্ডের স্থায়ী অধিবাসী ছিলেন। ২২শে নভেম্বর
তিনি দলের অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান গিয়েছিলেন। তিনি দেশেই
ফিরতে চেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩রা ডিসেম্বর তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশের
ভূখণ্ডে অবতরণে ব্যর্থ হয়। প্রথমে তা কলম্বোতে অবতরণ করে এবং পরে জেদ্দায়
যায়। কিছুদিন সেখানে অবস্থান করার পর গোলাম আযম আবার পাকিস্তানে ফিরে আসেন।
তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্টে ১৯৭২ সালে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গমন
করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি লন্ডন যান। সেখানে তিনি সংবাদপত্র মারফত তার
নাগরিকত্ব বাতিলের বিষয়টি জানতে পারেন। যাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছে তাদের
নাগরিকত্ব পুনর্বহালের জন্য ১৯৭৬ সালের ১৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকার
দরখাস্ত আহ্বান করে। আহ্বান অনুযায়ী গোলাম আযম কয়েক দফায় বাংলাদেশ সরকারের
কাছে নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এতে
সাড়া দেয়নি। ১৯৭৮ সালের ১১ই মার্চ তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। একই বছর
১১ই জুলাই মায়ের অসুস্থতার কারণে তাকে বাংলাদেশে আসতে অনুমতি দেয়া হয়। তিনি
পাকিস্তানি পাসপোর্টে বাংলাদেশে আগমন করেন। ১৯৭৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর তিনি
নাগরিকত্ব চেয়ে আবারও আবেদন করেন। একই সঙ্গে তার পাকিস্তানি পাসপোর্টও জমা
দেন। নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকাবস্থায় তিনি বাংলাদেশেই
অবস্থান করতে থাকেন।
১৯৯২ সালের ২৩শে মার্চ তাকে শোকজ করে
বাংলাদেশ সরকার। তাকে কেন বিদেশী নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে না এবং
তাকে কেন বহিষ্কার করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয় ওই নোটিশে। পরদিনই তাকে
গ্রেপ্তার করা হয়। ফরেনার্স অ্যাক্ট-এর ৩ ধারা অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করা
হয়। নাগরিকত্ব বাতিলের ১৯৭৩ সালের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে
হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন গোলাম আযম। ওই রিটে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে
যুক্তি দেখানো হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহায়ক বাহিনী
রাজাকার, আলবদর, আল শামস প্রভৃতি বাহিনী গঠনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন
গোলাম আযম। যেসব বাহিনী মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে জড়িত ছিল।
স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়ার পক্ষে গোলাম আযম বিশ্বব্যাপী
লবিং করেছিলেন বলে সরকার পক্ষ দাবি করেছিল। বিচারপতি মোহাম্মদ ইসমাইল
উদ্দিন সরকার এবং বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রিটে
বিভক্ত রায় দিয়েছিল। পরে তৃতীয় বিচারপতির বেঞ্চে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।
বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী বিচারপতি বদরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে একমত পোষণ
করে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিলের প্রজ্ঞাপন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন।
স্বাধীনতাযুদ্ধে গোলাম আযমের ভূমিকা নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যকে
অপ্রাসঙ্গিক বলেছিল হাইকোর্ট।
এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে
সরকার। রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলায় শুনানি করেছিলেন তৎকালীন এটর্নি জেনারেল
আমিনুল হক। গোলাম আযমের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন এ আর ইউসুফ। বিচারপতি মুহাম্মদ
হাবিবুর রহমান তার রায়ে ১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে
লিখেছেন, সংবিধান ৩ অনুচ্ছেদ এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারির এখতিয়ার দেয়নি।
একসঙ্গে ৩৯ জনকে নাগরিকত্বের জন্য কেন অযোগ্য ঘোষণা করা হলো তা-ও স্পষ্ট
নয়। বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণার বিষয়টি সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত
নয়। অনুচ্ছেদ ৩-এর অধীনে একটিমাত্র বিষয়ের সুরাহা হতে পারে আর তা হচ্ছে
তিনি বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার যোগ্য কিনা। নাগরিকত্ব প্রমাণে পাসপোর্ট কোন
চূড়ান্ত বিষয় নয়। গোলাম আযমের ব্যাপারে ১৯৭২ সালের দালাল আদেশে কোন ধরনের
তদন্ত হয়নি। তার বিরুদ্ধে কোন মামলাও দায়ের করা হয়নি। ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর
তালিকায় তার নাম নেই বলেও গোলাম আযমের দায়ের করা হলফনামায় বলা হয়েছে। রায়ে
বলা হয়েছে, এটা ঘরে ফেরার মামলা, শিকড়ে ফেরার মামলা এবং পূর্বপুরুষের
ভূমিতে ফেরার মামলা। গোলাম আযমের স্ত্রী এবং সাত সন্তানও জন্মসূত্রে
বাংলাদেশের নাগরিক। এইসব বিবেচনায় আপিলটি খারিজের আদেশ দেন বিচারপতি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান।
বিচারপতি এটিএম আফজাল তার রায়ে লিখেছেন,
অধ্যাপক গোলাম আযম তার নাগরিকত্ব চেয়ে রিট আবেদন দায়ের করেননি। বরং তিনি
১৯৭৩ সালের ১৮ই এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। গোলাম আযম তার
আবেদনে বলেছেন, এই প্রজ্ঞাপনটি আইনের দৃষ্টিতে শুদ্ধ নয়। সরকারের পক্ষ থেকে
বলা হয়েছে, গোলাম আযমের রাজনৈতিক আচরণও সমান অশুদ্ধ। কিন্তু এটা অভিযোগের
জবাব হতে পারে না। রাজনৈতিক অসদাচারণের অভিযোগ দ্বারা আইনি যুক্তি খণ্ডন
করা যায় না। গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রদানে রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি তুলে
ধরেছিলেন তৎকালীন এটর্নি জেনারেল। জবাবে বিচারপতি এটিএম আফজাল পঞ্চম সংসদ
নির্বাচনের আগে জামায়াতের কাছে বিএনপির সমর্থন চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ
করেছেন। দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জামায়াতের সমর্থন চাওয়ার বিষয়টিও বলেছেন
তিনি। তবে বিচারপতি আফজাল স্পষ্ট করেই বলেছেন, রাজনীতি আদালতের বিবেচ্য
বিষয় নয়, আদালতের বিবেচ্য বিষয় আইন এবং একমাত্র আইন। বিচারপতি মোস্তফা
কামাল তার রায়ে লিখেছেন, এটর্নি জেনারেলের সাবমিশন আবেগপূর্ণ, আইনি
বিশ্লেষণ কমই করেছেন তিনি। বিচারপতি দৈনিক রহমানও অপর তিন বিচারপতির সঙ্গে
একমত পোষণ করে রায় লেখেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন