কবে কিভাবে আওয়ামী সরকার বিদায় নেবে
Collected
শফিক রেহমান
২৯
ডিসেম্বর ২০০৮-এর সন্দেহজনক নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ
বিজয়ী হয়ে ৬ জানুয়ারি ২০০৯-এ সরকার গঠন করে। এর মাত্র ৪১ দিন পর থেকে
আওয়ামী সরকার স্বরূপে আবির্ভূত হতে থাকে। শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের ভিত্তিতে
দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাবার বদলে আওয়ামী সরকার মনোনিবেশ করে, যথাক্রমে,
ইনডিয়ার কাছে ব্যক্তি ও দলের ঋণ পরিশোধে, ষড়যন্ত্রে, মামলা দায়ের এবং
প্রতিপক্ষকে জেলে পাঠানোতে, দলীয় উদ্দেশ্য সাধনে বিচারবিভাগ বশীকরণে এবং
দলকে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়
আওয়ামী লীগের অন্তর্নিহিত চক্রান্তপ্রিয়তা ও অযোগ্যতা, যা এর আগের দুটি
আওয়ামী সরকারের সময়েও দেখা গিয়েছিল, যেমন পুলিশ বাহিনীসহ প্রশাসনকে
দলীয়করণ, অর্থনৈতিক ম্যানেজমেন্টে অদক্ষতা, শীর্ষ পর্যায় থেকে স্থানীয়
পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক দুর্নীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিভিন্ন দিবস পালনে
আসক্তি ও ব্যক্তি পূজায় মত্ত হয়ে নাম বদলের নেশা প্রভৃতি।
তাই এটা কোনো আশ্চর্য নয় যে আওয়ামী সরকারের গত চার বছর চার মাস শাসনে যে
পনেরটি বড় বিপর্যয় বাংলাদেশে ঘটেছে, তার মধ্যে বারোটির সঙ্গেই আওয়ামী সরকার
ও দলের নিবিড় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এই বারোটি হলো :
এক. ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ ঢাকায় পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৭৩ জন নিহত হন,
যার মধ্যে ছিলেন ৫৭ সেনা অফিসার। এই বিদ্রোহে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও
মামলা চলা কালে মৃত্যু হয় ৫৭ বিডিআর কর্মচারির। অভিযোগ ওঠে এ ঘটনার বিষয়ে
আগেই জানতেন আওয়ামী সরকারের প্রতিমন্ত্রী নানক, নেতা মির্জা আজম ও
ব্যারিস্টার তাপস। ওই ঘটনায় নিহত বিডিআর চিফ, জেনারেল শাকিলের ছেলে লন্ডন
থেকে দাবি করেন, ঘটনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই জানতেন এবং সে জন্যে তিনি
এই দিনে পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পিলখানায় যাননি। সার্বিক ভাবে
তদানিন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের অযোগ্যতা এবং প্রধানমন্ত্রীর
ভুল সিদ্ধান্তের ফলে পিলখানায় নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
দুই. ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার দেশের চলমান বিদ্যুত্ সঙ্কট মেটানোর লক্ষ্যে
স্থায়ী সাশ্রয়ী পদক্ষেপ না নিয়ে এগিয়ে যায় ব্যায়বহুল কুইক রেন্টাল সিস্টেম
স্থাপনে। ফলে একটি সূত্র মতে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি,
বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড) ক্ষতি ২৫,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
আওয়ামী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রাইভেট কুইক রেন্টাল কম্পানি
থেকে বেশি দামে বিদ্যুত্ কিনে তা কম দামে বিক্রি করায় প্রতি বছর বিপিডিবি-র
ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিডিবি-র এক কর্মকর্তা জানান, রেন্টাল পাওয়ার
প্লান্ট থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত্ কিনতে খরচ পড়ছে ১৪ থেকে ১৭ টাকা।
কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আট টাকার মধ্যে। এখানে
অর্ধেকই ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির যে ৯,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে তার
৮০ শতাংশই দিতে হচ্ছে কুইক রেন্টাল থেকে বেশি দামে বিদ্যুত্ কেনায়।
অর্থাত্, রেন্টাল কম্পানিগুলো লাভ করছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাওয়ার
ডেভেলপমেন্ট বোর্ড তথা সরকার এবং সাধারণ গ্রাহক যাদের বেশি দামে বিদ্যুত্
কিনতে হচ্ছে।
কুইক রেন্টাল সিসটেমে যারা জড়িত তাদের মধ্যে নাম এসেছে মন্ত্রী (এবং
প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়) কর্ণেল ফারুক খান ও আজিজ গ্রুপ, গার্মেন্টস
রফতানিকারক মোহাম্মদী গ্রুপ, ফার্নিচার বিক্রেতা অটবি গ্রুপ, সালমান
রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ ইত্যাদি।
তিন. ১০ জানুয়ারি ২০১০-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের সফরে নতুন
দিল্লিতে যান। এই সফরের সময়ে দুই দেশের মধ্যে তিনটি চুক্তি ও দুটি সমঝোতা
চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর বাইরে আরো একটি নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত
হয়েছে বলে মিডিয়াতে উল্লেখ করা হয়। এখন পর্যন্ত এসব চুক্তি সংসদে আলোচিত
হয়নি। কিন্তু ২০১০ সাল থেকেই আশুগঞ্জ-আখাউড়া স্থলপথে ইনডিয়া ট্রানজিট
সুবিধা নেয়। ইনডিয়ানরা তাদের হেভি লরি চলাচলের জন্য ১৬টি কালভার্ট বন্ধ করে
দেয় এবং তিতাস নদীর দুটি স্থানে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশের
পূর্বাঞ্চলে গুরুতর পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। বিষয়টি দৈনিক নয়া দিগন্তে এই লেখক
কর্তৃক প্রকাশের পরে ইনডিয়ানরা সাময়িকভাবে ওই স্থলপথে তাদের লরি চলাচল
বন্ধ করে দেয়।
চার. ২০১০-এর শেষাংশে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারিতে একটি হিসেবে দেশের ৩৩ লক্ষ
বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি প্রতিটি বিনিয়োগকারীর পেছনে পাঁচজন
আত্মীয়-বন্ধু সেকেন্ডারি বিনিয়োগকারী থাকে তাহলে দেশে মোট ক্ষতিগ্রস্তের
সংখ্যা হবে এক কোটি ৬৫ লক্ষ। অর্থাত্ দেশের এক দশমাংশ জনসংখ্যার কিছু বেশি।
ডেইলি স্টার (১০.১০.২০১০) সহ কয়েকটি পত্রিকা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক
এক্সচেঞ্জের হুশিয়ারি সত্ত্বেও শেয়ার বাজার বিপর্যয়ের মুখে এগিয়ে যেতে
থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ উপেক্ষা করে চলে আগাম
সতর্কবাণীগুলো। নভেম্বর ১৯৯৬-এ আওয়ামী সরকারের সময়ে যেমন শেয়ার বাজারে ধস
নেমেছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটে পনের বছর পরে আবার চলতি আওয়ামী সরকারের সময়ে
অক্টোবর ২০১১-এ।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হয়ে যান। দিশাহারা বিনিয়োগকারীরা মতিঝিলে
প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করলে প্রধানমন্ত্রীর অথনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড.
মসিউর রহমান বলেন, ‘ওরা দেশের শত্রু। সমাজের শত্রু। ওদের জন্য মাথা ঘামানোর
কোনো কারণ নেই। তাদের কষ্টে আমার মন কাঁদে না। শেয়ারবাজার ধসে সরকারের
মাথাব্যথার কিছু নেই। কারণ শেয়ারবাজারে পুঁজি প্রকৃত বিনিয়োগে যায় না...
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখে না।’ (আমার
দেশ ২১.০১.২০১১)
অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত এক পর্যায়ে সংসদে বলেন, ‘আমি জানি আমি দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি।’
এই কেলেঙ্কারিতে যারা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে তাদের মধ্যে আছেন, ম্যানপাওয়ার
বিজনেস খ্যাত জনৈক আওয়ামী এমপি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ
কামালের সেই সময়ের বন্ধু ও বর্তমানে “দরবেশ” রূপে খ্যাত ব্যক্তি, প্রমুখ।
পাচ. ১১ ডিসেম্বর ২০১১-তে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ
নিতে আদিষ্ট হয় চট্টগ্রামের মিরসরাইতে কিছু স্কুল ছাত্র। ওই টুর্নামেন্টে
অংশ নিতে যাবার পথে ট্রাক উল্টে ৫৩ স্কুল ছাত্রের মৃত্যু হয়।
ছয়. দীর্ঘকাল জুড়ে বিভিন্ন দিক থেকে মালটি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম)
কম্পানি ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারকে বারবার সতর্ক করে দেওয়া
সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা। সম্ভাব্য কারণ ছিল, এই গ্রুপের
প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও কট্টর আওয়ামীপন্থী রূপে
পরিচিত সাবেক সেনা প্রধান লে: জে: হারুন-অর-রশিদ।
অবশেষে ১১ জুলাই ২০১২-তে দুদক বাধ্য হয় পদক্ষেপ নিতে। ডেসটিনির ৩,২৮৫ কোটি
টাকা মানি লন্ডারিং ও আত্মসাতের মামলায় জেনারেল হারুনকে টানা সাত ঘণ্টা
জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক তদন্ত টিম। ওই তদন্তে দুদক জানতে চায় জেনারেল হারুনের
ব্যাংক একাউন্টে ২০ কোটি টাকা ঢুকলো কিভাবে? উত্তরে হারুন বলেন, ‘মাসিক
সম্মানী, ডিভিডেন্ড ফান্ড, এলাউন্স, কমিশন বাবদ এই টাকা আমার একাউন্টে
ঢুকেছে। এছাড়া কিছু টাকা বাড়ি ভাড়া থেকেও এসেছে।’ (যুগান্তর ৫.১১.২০১২)
হাই কোর্ট জেনারেল হারুনকে আটটি শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেয়। তবে ডেসটিনি
গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিকুল আমীন, ডিরেক্টর দিদারুল আলম ও
ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন-কে জেলে যেতে হয়।
ডেসটিনির বিরুদ্ধে অর্থের অবৈধ ব্যবহার সংক্রান্ত দুটি মামলায় আসামীর
সংখ্যা ২২ হলেও ১৮ জনই পলাতক হয়। ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট ৫৩৩ ব্যাংক একাউন্ট
জব্দ করা হলেও তাদের অঙ্গ সংগঠন বৈশাখী টেলিভিশনের একাউন্ট জব্দ হয় নি। এই
লাইফলাইনের জন্য কৃতজ্ঞ বৈশাখী টিভির কর্মকর্তারা সুকৌশলে তাদের টিভিতে এবং
অন্যান্য টিভির টকশোতে আওয়ামী সরকারের পক্ষে এবং আমার দেশ পত্রিকার
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জেলবন্দি মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে
যাচ্ছেন।
ডেসটিনি ছাড়া আরো ত্রিশটির বেশি এমএলএম কম্পানি অবাধে মানুষকে প্রতারণা
করার সুযোগ পায় আওয়ামী সরকার শাসনে। এসব কম্পানির মধ্যে রয়েছে ইউনিপে টু
ইউ, সাকসেস লিংক, গ্লোবাল নিউওয়ে, প্রভৃতি। দুদকের তদন্ত অনুযায়ী, কয়েকটি
এমএলএম প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে ৪,৯৬৩ কোটি টাকার কিছু
বেশি এবং এর মধ্যে ব্যক্তিগত একাউন্টে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল প্রায় ৪,৬০১ কোটি
টাকা। (প্রথম আলো ৯.৯.২০১২)।
টাকা বানানোর এমন সহজ সুযোগ দেখে ২০০৫-এ এগিয়ে আসে চায়না থেকে তিয়ানশি
(বাংলাদেশ) লিমিটেড। (আমাদের সময়.কম ৫.১১.২০১২)। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, মোট
১২৯ এমএলএম কম্পানি তাদের নজরদারিতে আছে।
সাত. আগস্ট ২০১২-তে বিভিন্ন পত্রিকায় হলমার্ক গ্রুপের জালিয়াতির খবর
প্রকাশিত হতে থাকে। জানা যায় সরকারি ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের শেরাটন হোটেল
ব্রাঞ্চে (বর্তমানে শেখ হাসিনার দেয়া নাম রূপসী বাংলা হোটেল) বাংলাদেশের
ইতিহাসে সবচেয়ে কুশ্রী অর্থনৈতিক কেলেংকারির পরিমাণ ৩,৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ বা
প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্ক একাই নিয়েছে প্রায় ২,৬৬৮ কোটি
টাকা। একটি ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চে একটি কম্পানির এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের
ঘটনা আর কোথাও ঘটেছে বলে ব্যাংকিং খাতের কেউ বলতে পারেন নি। বাংলাদেশে এর
আগে বিভিন্ন সময়ে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটলেও অঙ্কের বিচারে এটি
সর্ববৃহত্। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিই ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশের
সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। (প্রথম আলো ৫.৯.২০১২)।
এরপর এক গোলটেবিল অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে
গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে
আমরা ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিই। এর মধ্যে মাত্র তিন বা চার হাজার কোটি
টাকা নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এটা কোনো বড় অঙ্কের অর্থ নয়। এ নিয়ে হইচই করারও
কিছু নেই। সংবাদমাধ্যমে এটা নিয়ে অতিরিক্ত প্রচারণা করে দেশের ক্ষতি করছে।
এমন ভাব যেন দেশের ব্যাংকিং সেক্টর ধসে গেছে। এতে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন
হতে হচ্ছে।’
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রচারের পর গতকালই ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, কেলেঙ্কারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সোনালী ব্যাংকের
পরিশোধিত মূলধন এক হাজার ১২৫ কোটি টাকা। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত তৈরি করা তথ্য
অনুযায়ী, সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ চার হাজার ৫১৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অথচ
সোনালী ব্যাংকের এক রূপসী বাংলা শাখায় জালিয়াতি করা অর্থের পরিমাণই তিন
হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্য কোনো বেসরকারি ব্যাংকে এই পরিমাণ অর্থ
আত্মসাতের ঘটনা ঘটলে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেত। যেমন বন্ধ হয়েছিল ওরিয়েন্টাল
ব্যাংক। (প্রথম আলো ০৫.০৯.২০১২)
অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর দেশজুড়ে সমালোচনার সিডর ওঠে। দি নিউজ টুডে-র
সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ লেখেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে অর্থমন্ত্রী অধিক থেকে
অধিকতর পরিমাণে অধৈর্য হয়ে উঠছেন, মিডিয়ায় তার সমালোচকদের সহ্য করতে
পারছেন না। তার সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তাকে ননসেন্স, রাবিশ ও স্টুপিড
জাতীয় শব্দ শুনতে হয়। সোনালী ব্যাংক দুর্নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী যে অসহিষ্ণু
আচরণ করেছেন, তাতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। সোনালী ব্যাংকের দুর্নীতি
নজরদারীতে ব্যর্থতার জন্য ওই ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদকে বিলুপ্ত করার
অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই অনুরোধ অবজ্ঞা করতে তিনি
দ্বিধান্বিত হননি।’ (মানবজমিন ০৭.০৯.২০১২)
যে কারণে অর্থমন্ত্রী মুহিত অসহিষ্ণু হন, ঠিক সেই একই কারণে আওয়ামী মিডিয়া
হলমার্ক কেলেঙ্কারি বিষয়ে খবর প্রকাশে কার্পণ্য প্রকাশ করে। কিন্তু তখন
এগিয়ে আসে দৈনিক মানবজমিন। এই পত্রিকার দুটি সাহসী রিপোর্টে জানা যায়
হলমার্ক কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীর মাহমুদ তফসিরের উত্থান কাহিনী এবং তার
সঙ্গে আওয়ামী সরকারের সংশ্লিষ্টতা।
প্রথম রিপোর্টে লায়েকুজ্জামান জানান, মাত্র এক দশক আগে আগারগাঁও তালতলা
বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান ছিল তার। এ দোকান চালাতেন পিতাকে সঙ্গে নিয়ে।
এতে সংসার চলতো না তাদের। এই সময়ে সংসারে অভাব-অনটন ঘোচাতে মাত্র ৩,০০০
টাকা বেতনে একটি গার্মেন্ট কম্পানিতে চাকরি নেন। মাত্র এক দশক পরে সেই
গার্মেন্ট শ্রমিক এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। রাজকীয় বিলাসী জীবন তার।
মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় চোখ ধাঁধানো রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি। বাড়ির ভেতরটা যেন
স্বর্গপুরী। বিদেশি সব কারুকার্য খচিত ফিটিংস ও ঝাড়বাতি। ঝকঝকে তকতকে দামি
সব গাড়ি। শেওড়াপাড়ার এই বাড়ির পাশেই বিশাল গ্যারাজ। পাজেরো, প্র্যাডো,
ল্যান্ডক্রুজার মিলে বড় গাড়ি ১৫টি। প্রাইভেট কার ১২টি।
যখন যেটি পছন্দ হয় সেটি নিয়ে বের হন। তানভীর চলেন রাজকীয় স্টাইলে। রাজপথে
তার গাড়ির আগে-পিছে থাকে ১০টি গাড়ি। এসব গাড়িতে থাকে তার সশস্ত্র
ক্যাডাররা। এরা সবাই তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। মানুষকে খাওয়ানোর
জন্য কখনও একটি-দু’টি গরু কেনেন না, গরু কেনেন ট্রাক ভরে। এখন গ্রামের
বাড়িতে যান ঘন ঘন। সেখানে উত্সব করেন, মানুষকে খাওয়ান, সংবর্ধনা নেন।
চলাফেরা করেন ক্ষমতাধর বড় বড় লোকদের সঙ্গে। তার ২০৫/৪ রোকেয়া সরণি
শেওড়াপাড়ার কার্যালয়ে মাঝেমধ্যে আসেন বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টা, একজন
প্রতিমন্ত্রী ও কয়েকজন এমপি। এখন তার বিলাসী জীবন হলেও মাত্র এক দশক আগেও
ছিলেন কপর্দকশূন্য। থাকতেন শেওড়াপাড়ার ভাড়ার বাসায়।
২০০১ সালেও আগারগাঁও তালতলা বাজারে ছোট একটি মুদি দোকান ছিল তানভীরের
পিতার। সকালে-বিকালে মুদি দোকানে পিতার সহযোগী ছিলেন তিনি। সংসারের নিদারুণ
অভাব-অনটন ঘোচাতে মাত্র ৩০০০ টাকা বেতনে একটি গার্মেন্ট কম্পানিতে চাকরি
নেন তানভীর। তার উত্থান শুরু তত্ত্বাবধায়ক জমানার শেষ দিকে। গার্মেন্টের
চাকরি ছেড়ে নিজে একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি দেন। ওই সময় তার সঙ্গে সম্পর্ক
হয় সোনালী ব্যাংক শেরাটন শাখার সে সময়ের ম্যানেজারের সঙ্গে। ওই ম্যানেজারকে
ধরে অল্প কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। সেটা ২০০৬ সাল। ২০০৮ সালে
সরকার পরিবর্তন হলে তানভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন বর্তমান সরকারের একজন
প্রভাবশালী উপদেষ্টার সঙ্গে। ওই উপদেষ্টাকে তিনি তার প্রতিষ্ঠান হলমার্কের
উপদেষ্টা করেন। ২০০৯ সাল থেকে সকল নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সোনালী ব্যাংকে
তানভীরের ঋণ বর্ধিত হতে শুরু করে অস্বাভাবিকভাবে ।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে তানভীর বেশি নজর দেন জমি কেনার দিকে।
মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায়। একের পর এক জমি কিনতে থাকেন বেশি দামে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত তানভীর কম করে
হলেও ত্রিশটি দামি গাড়ি উপহার দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের বড় বড় কর্মকর্তা ও
রাজনৈতিক নেতাদের। দেড়শ’ জন আনসার পাহারা দেয় রোকেয়া সরণির হলমার্কের
প্রধান কার্যালয়সহ তানভীরের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তানভীরের নিজের
কাছে থাকে একটি পিস্তল। সব সময় চলেন বিশাল বহর নিয়ে। মিরপুর শেওড়াপাড়া
এলাকা এবং সাভারের হেমায়েতপুরে আছে তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী। শেওড়াপাড়া
এলাকার তার এক প্রতিবেশী জানান, তানভীর তার বর্তমানের রাজকীয় বাড়িতে উঠেছেন
মাত্র দুই বছর হলো, এর আগে ওই মহল্লারই একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন সপরিবারে।
নতুন বাড়িতে ওঠার পর গত দু্ই বছর ধরে ঈদের সময় এক এলাহি কাণ্ড দেখা যায়
তার বাড়ির সামনে। পুরো রমজান মাস ধরে গরু, মহিষ, উট আসে ট্রাক বোঝাই করে।
ওই সব গরু, মহিষ, উট জবাই করে খাওয়ানো হয় রোজাদারদের। দান-খয়রাতও করেন
যথেষ্ট।
মিরপুর এলাকার মানুষ জানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে আগামী নির্বাচনে
অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সে কারণে এখন ঘন ঘন এলাকায় যাচ্ছেন
ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে। (মানবজমিন, ১.৯.২০১২)
একই দিনে দ্বিতীয় রিপোর্টে জাবেদ রহিম বিজন জানান, রাজকীয় সেই সংবর্ধনার
কথা এখন মুখে মুখে। কোটি টাকা খরচ করে বিশাল আয়োজনের সেই সংবর্ধনার গল্প
নতুন করে উঠে এসেছে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মুখে মুখে। আলোচিত শিল্প
প্রতিষ্ঠান হলমার্কের মালিক তানভীর মাহমুদ তফসিরের এত্ত বড় সংবর্ধনার রহস্য
মানুষ ভেদ না করতে পারলেও এখন বুঝতে পারছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের
তারুয়া গ্রামের মানুষ। সংবর্ধনার আগে কেউ তার নামও শোনেনি। সংবর্ধনার সময়েই
আলোচনা ছড়িয়েছিল আগামী সংসদ নির্বাচনে সরাইল-আশুগঞ্জ আসন থেকে মনোনয়ন
চাইবেন তানভীর। এর অংশ হিসেবেই বিশাল সংবর্ধনা।
গত বছরের ২০ জানুয়ারি হয় এই সংবর্ধনা। সংবর্ধনার একদিন আগেই এ ব্যবসায়ী চলে
আসেন গ্রামের বাড়িতে। নিজেই তদারকি করেন সব। এর আগে বিজিএমইএ আয়োজিত ২২তম
বাটেক্সপোতে পোশাক শিল্পের সেরা উদ্যোক্তার পুরস্কার পান তানভীর মাহমুদ। এ
উপলক্ষেই বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন।
সংবর্ধনায় যোগদানকারীদের অনেকেই তখন বলেন, সংবর্ধনার আয়োজন চোখ ধাঁধিয়ে
দিয়েছে সবার। বলাবলি হচ্ছিল, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানও
এত গর্জিয়াস হয় না। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ঘিরে ওই ব্যবসায়ীর গ্রাম তারুয়ায়
সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছিল। বসানো হয়েছিল মেলা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রায় দুই
সপ্তাহ আগে থেকে জেলার প্রায় সর্বত্র লাগানো হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের ঢাউশ
সাইজের পোস্টার। পোস্টারের অর্ধেকাংশে জুড়ে দেয়া হয় ট্রফি গ্রহণের সেই ছবি।
প্রায় ১০ হাজার পোস্টার লাগানো হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি
ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা। তবে বিশেষ অতিথি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক
প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম ও সংসদ সদস্য আ ম ওবায়দুল
মুকতাদির চৌধুরী এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
জানা গেছে, সংবর্ধনার মঞ্চ তৈরি ও অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয়
ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রায় ২০ লাখ টাকা চুক্তি হয় তাদের সঙ্গে। বিশাল
প্যান্ডালে ৩ সহস্রাধিক লোক বসার ব্যবস্থা করা হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে
বসানো হয় ৩১টি স্পিকার, ২টি ডিজিটাল ডিসপ্লে। নিরাপত্তার আয়োজনে ছিল ক্লোজ
সার্কিট ক্যামেরা ও মেটাল ডিটেক্টর। ছিল ৫শ’ কেভির দুটি জেনারেটর। দুপুরে
আপ্যায়ন করা হয় হাজারেরও বেশি অতিথিকে। খাবার মেনুতে ছিল বিভিন্ন জাতের মাছ
আর মুরগি। সবকিছু দেখাশোনার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় দেড় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক।
পুরো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি একটি প্রাইভেট চ্যানেলে ২০ মিনিট প্রচারের
চুক্তিও করা হয়। ২শ’ ফুলের তোড়া আনা হয় অতিথিদের দেয়ার জন্য। সংবর্ধিত
ব্যবসায়ী প্রধান অতিথির কাছ থেকে গ্রহণ করেন সোনার ক্রেস্ট। অতিথিদের ফুল
দেয়ার জন্য ছিল ২০ তরুণী। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ৩শ’ গাড়িতে করে আসেন
হলমার্কের স্টাফরা। গাড়িতে গাড়িতে সয়লাব হয়ে যায় তারুয়া গ্রামের সব
রাস্তাঘাট। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চের পাশে বসানো হয় মেলা। মেলা চলে ৩ দিন
ধরে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ানোর জন্য আনা হয় ঢাকা থেকে প্রখ্যাত
শিল্পীকে। সব মিলিয়ে হুলুস্থুল কারবার।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক চিত্রগ্রাহক বলেন, আমি প্রথমে গিয়ে গরু-ছাগলের ভিড় দেখে
মনে করেছিলাম, এখানে কোন হাট বসেছে। পরে আমার ভুল ভাঙে। এগুলো অতিথিদের
খাওয়ানোর জন্য জড়ো করা হয়েছিল। এই ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির পরিচয় এতদিন
তারুয়া গ্রামেই ছিল সীমাবদ্ধ। সংবর্ধনার আয়োজন আর প্রচারণা তাকে জেলাব্যাপী
পরিচিত বা আলোচিত করে তোলে। আর হলমার্ক-কেলেঙ্কারির পর রাজকীয় সংবর্ধনা
কথা এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর মুখে মুখে। (মানবজমিন ১.৯.২০১২)
পরবর্তীকালে তানভীরের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম ও
আওয়ামী এমপি ওবায়দুল মুকতাদিরের সম্পর্ক বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।
লায়েকুজ্জামান ও জাবেদ রহিম বিজনের দুটি রিপোর্টে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার
নামটি অপ্রকাশিত থাকে। পরবর্তী সময়ে এই নামটিও প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন
চোখের ডাক্তার সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী এবং তিনি স্বীকার করেন শেরাটনের সোনালী
ব্যাংক ব্রাঞ্চে তার যাতায়াত ছিল।
৪ অক্টোবর ২০১২-তে এসব আওয়ামী নেতার স্নেহপুষ্ট তানভীর শেষ পর্যন্ত
গ্রেফতার হন। তার সঙ্গে গ্রেফতার হন তার স্ত্রী জেসমিন ও ভায়রা তুষার
আহমেদ। হলমার্কের সাত এবং সোনালী ব্যাংকের ২০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা
দায়ের করে দুদক।
এর কয়েকদিন পরে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, ‘২০১০ সালেই হলমার্কের বিষয়টি
বাংলাদেশ ব্যাংক জেনেছিল। ২০১০ সালে তারা কিছুই করেনি। ২০১২ সালে তারা জেগে
উঠল। এতে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে অতটা সক্ষম নয়।’ (প্রথম আলো
১৭.১০.২০১২)।
যেটা অর্থমন্ত্রী বলেননি সেটা হলো, তিনি নিজেই ‘২০১০ সাল থেকে ঘুমিয়ে
ছিলেন’ এবং তাই তিনি কিছুই করেননি। তার বক্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, তার সঙ্গে
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আতিউর রহমানের চরম দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং তিনি
(অর্থমন্ত্রী) এই অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে অক্ষম।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ স্থানে থাকতে মুহিত ভালোবাসেন। সামরিক শাসনের
তীব্র সমালোচক হলেও সামরিক শাসক এরশাদের প্রথম অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।
এরপর শেখ হাসিনার অর্থমন্ত্রী হয়েছেন। তবে অর্থমন্ত্রী কখনোই পদত্যাগের
ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। সূচনা থেকেই একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও
প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেননি। সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী
ভেবেছিলেন, তার নিজের মাথার ওপর পদ্মা সেতু দুর্নীতিবিষয়ক ওয়ার্ল্ড
ব্যাংকের ঝুলন্ত ডেমোক্লিসের তলোয়ার মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাবেক এই
অলটারনেট ডিরেক্টর মুহিতের সাহায্য দরকার হবে। মুহিত অর্থমন্ত্রী থেকে যান।
কিন্তু মুহিত পারেননি তার বসকে বাঁচাতে।
অন্যদিকে আতিউর রহমানও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে যান। সম্প্রতি তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
আর ড. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীও তার উপদেষ্টা পদে বহাল আছেন।
আওয়ামী সরকারের এই আমলে আর্থিক ক্ষেত্রে অনেক কমেডির মধ্যে এটি একটি।
আট. ২৪ নভেম্বর ২০১২-তে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের গার্মেন্টস
কারখানায় আগুন লেগে ১১১ কর্মী পুড়ে মারা যায়। তাজরীনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর
দেলোয়ার হোসেন একজন সরকার সমর্থক ব্যক্তি রূপে পরিচিত।
নয়. দুই দিন পরেই ২৬ নভেম্বর ২০১২-তে চট্টগ্রামে বহদ্দার পুকুর পাড়ে
নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের গার্ডার ধ্বসে ১৫ জন নিহত হয়। প্রয়াত আওয়ামী লীগ
নেতা জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাকটো
পারিসা লিমিটেড এবং মীর আক্তার কনসট্রাকশন দুটি ফার্ম যুগ্মভাবে এই
ফ্লাইওভার নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছিল।
দশ. ১১ জানুয়ারি ২০১৩-তে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দেয় আওয়ামী
সরকারের দুর্নীতির কারণে তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না।
ইতিপূর্বে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন এই অভিযোগটি আনে, তখন বহু গড়িমসির পরে
যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তাকে
‘দেশপ্রেমিক’ রূপে আখ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। আবুল হোসেন ইতিমধ্যে শেখ
হাসিনার ছবিসহ তিনটি বড় বিলবোর্ড স্থাপন করেন ফার্মগেট থেকে প্রধানমন্ত্রীর
সচিবালয় পর্যন্ত, যেখানে শেখ হাসিনার স্তুতি বড় অক্ষরে দেখানো হয়েছে।
পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে আওয়ামী সরকারের অন্যান্য কারা জড়িত ছিলেন সে বিষয়ে
গুঞ্জন শোনা গেলেও মেইনস্টৃম পত্রিকায় অসমর্থিত থেকে যায়।
এগারো. কিন্তু ১৯ এপৃল ২০১৩-তে কানাডায় টরন্টোর আদালতে কানাডিয়ান কম্পানি
এসএনসি-লাভালিন ও পদ্মা সেতু দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলায় এসব নাম প্রকাশিত
হয়।
আদালতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ডায়রিতে প্রথমেই রয়েছে মন্ত্রীর কথা। সংক্ষেপে
লেখা হয়েছে, এমআইএন বা মিন। এই ব্যক্তি হচ্ছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ
আবুল হোসেন। মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ ৪ শতাংশ ঘুষ।
কায়সার লিখে তার পাশে লেখা রয়েছে ২ শতাংশ। এই কায়সার হচ্ছেন সাবেক
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুুরী। তিনিই এসএনসি-লাভালিনের সঙ্গে
যা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছিলেন।
এর পরই রয়েছে নিক্সনের নাম। কাজ পেলে তিনিও ২ শতাংশ ঘুষ পেতেন। এই নিক্সন
হচ্ছেন মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী। ডায়রিতে তার পরিচয় লেখা রয়েছে
প্রধানমন্ত্রীর ভাতিজা। নিক্সন চৌধুরী হুইপ নুরে আলম চৌধুরীর ছোট ভাই। নুরে
আলম চৌধুরী লিটন চৌধুরীর ছোট ভাই। নুরে আলম চৌধুরী লিটন চৌধুরী নামে
পরিচিত। তিনি শেখ হাসিনার ফুপাত ভাইয়ের ছেলে। তিনিও দুই পক্ষের মধ্যে
যোগাযোগ করিয়ে দেন।
এরপর রয়েছে ‘মসি রহমানের নাম’ তিনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক
উপদেষ্টা মশিউর রহমান। তার নামের পাশে রমেশ শাহ (লাভালিনের সাবেক
কর্মকর্তা) লিখে রেখেছেন ১ শতাংশ ঘুষের কথা।
আরো ১ শতাংশ অর্থ ঘুষের জন্য ডায়রিতে, ‘সেক্রেটারি’ কথা লেখা রয়েছে। এই সেক্রেটারি হচ্ছেন সাবেক সেতু সচিব মোশারফ হোসেন ভূইয়া।
সূত্র জানায়, নিক্সনের নামের পরই রয়েছে আরেকটি নাম। তার জন্য বরাদ্দ ২ শতাংশ বলে ডায়রিতে উল্লেখ রয়েছে। (প্রথম আলো ২০.০১.২০১৩)
পাঠকরা লক্ষ্য করুন মোটা হরফের শব্দগুলো। আরেকটি নাম ...। টরন্টোর কোর্টে
অভিযোগ গঠনের সময়ে উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলো, ইত্তেফাকসহ আরো কয়েকটি
পত্রিকার প্রতিনিধি। তারা সবাই জানেন নামটি কার। এই আরেকটি নাম যে কার,
সেটা প্রথম আলোর সম্পাদকসহ আরো বহু সম্পাদক জানেন। তাদের সঙ্গে জেলবন্দি
সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের পার্থক্য এই যে, মুক্ত থাকলে স্কাইপ সংলাপ এবং
রাজীবের নূরানীচাপা-র মতো কানাডায় প্রকাশিত সব নামই হয়তো তিনি দৈনিক আমার
দেশ-এ প্রকাশ করতেন জাতীয় স্বার্থে। এই অতি স্পর্শকাতর নামটি উচ্চারিত হতে
পারে সেই দুশ্চিন্তায় কানাডায় মামলা শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশে মাহমুদুর
রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। বস্তুত, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনের কল্যাণে এই
স্পর্শকাতর নামটি এখন আর গোপন নেই। এটি অনেকেই জানেন। সম্ভবত শেখ হাসিনা ও
তার বোন শেখ রেহানাও জানেন। আগামী ২৯ মে-তে টরেন্টোর সুপিরিয়র কোর্টে এই
মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হবে। তখন এই নামটি হয়তো আবার আদালতে উচ্চারিত
হবে। তখন হয়তো বাংলাদেশের সবাই নামটি জানবে।
পদ্মা সেতুর পরামর্শকের কাজটি পেলে এসএনসি-লাভালিন আয় করত ৪৭ লক্ষ ডলার
অর্থাত্ ৩৭৬ কোটি টাকা। এ ১২ শতাংশ হিসেবে ঘুষ দেয়ার কথা ছিল ৪৫ কোটি ১২
লক্ষ টাকা।
বারো. বুধবার ২৪ এপৃল ২০১৩-তে সাভারে সকাল নয়টার দিকে নয়তলা ভবন রানা
প্লাজা হঠাত্ ধসে যায়। এই দুর্ঘটনায় হতাহতদের উদ্ধারের কাজ এখন চলছে। (সুত্র, আমার দেশ, ২৮/০৪/২০১৩)
2
আওয়ামী
লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে গত চার বছর চার মাসে যে পনেরটি বড় মানবিক ও
আর্থিক বিপর্যয় ঘটেছে তার মধ্যে বারোটির সঙ্গে
প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা-নেতাদের বিভিন্ন মাত্রায়
সম্পৃক্তির অভিযোগ উঠেছে। এই বারোটি ঘটনার লিস্ট এর আগের লেখাটিতে দেয়া
হয়েছে। বাকি তিনটি ঘটনা হলো মুন্সীগঞ্জে লঞ্চডুবিতে ১১২ জনের মৃত্যু
(১৪.৩.২০১০) ঢাকায় নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু (৩.৬.২০১০) এবং
নরসিংদিতে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২০ জনের মৃত্যু (১০.১২.২০১০)।
যে এক ডজন ঘটনায় আওয়ামী মন্ত্রী-নেতারা সম্পৃক্ত ছিলেন তার মধ্যে সর্বশেষটি
হচ্ছে ২৪ এপৃল ২০১৩-তে সকাল পৌনে ৯টায় সাভারে নয়তলা বিশিষ্ট রানা প্লাজা
ধস। এই দুর্ঘটনায় এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত ৩৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত
অবস্থায় ২,৫১৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এবং এখনো অজানা সংখ্যক ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপে মৃত অথবা জীবিত অবস্থায় আছেন।
ইনডিয়ার ভূপাল, মধ্যপ্রদেশে, ইউনিয়ন কারবাইড ফ্যাকটরিতে গ্যাস লিকেজের ফলে
২ ডিসেম্বর ১৯৮৪ দিবাগত রাতে যে দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল, এখন পর্যন্ত সেটাই
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইনডাস্টৃয়াল অ্যাকসিডেন্ট। এ মুহূর্তে ওয়ার্ল্ড মিডিয়া
মনে করছে সাভার দুর্ঘটনা তার পরেই দ্বিতীয় স্থানটি অধিকার করবে। শেখ
হাসিনার উত্সাহে সরকারের বহু ট্যাকটিকস সত্ত্বেও সুন্দরবনকে পৃথিবীর সপ্তম
আশ্চর্যের অন্যতম করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন অতি সহজেই বাংলাদেশ যে একটি
বিশ্ব রেকর্ডের কাছাকাছি পৌছালো তার জন্য হাসিনা সরকার কৃতিত্ব দাবি করতে
পারে।
সাভার ট্র্যাজেডি একদিনে ঘটেনি। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার ৪১ দিন পরেই
পিলখানায় বিডিআর-আর্মি ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে পরপর আরো দশটি ট্র্যাজিক
ঘটনায় পুঞ্জিভূত আওয়ামী অযোগ্যতা, অদক্ষতা, স্বজন ও দলপ্রীতি এবং দুর্নীতি
প্রভৃতির ফলেই বারো নাম্বার ট্র্যাজেডি অর্থাত্ সাভার দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
মূল্যবোধের অভাব
তাই সাভার ট্র্যাজেডিকে এককভাবে বিবেচনা করলে চলবে না। বুঝতে হবে আওয়ামী
সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মূল্যবোধের যে বিরাট অভাব রয়েছে, ন্যায় ও নীতির
যে বিপুল ঘাটতি রয়েছে এবং সততার যে বিশাল শূন্যতা রয়েছে তারই পরিণামে
সাভারে এত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, এত মানুষ পঙ্গু হয়েছে এবং এত মানুষ
নিখোঁজ হয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের নৈতিক দেউলিয়াত্ব আওয়ামী সরকার ও দলের
মধ্যে প্রতিটি পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। ফ্রম শেখ হাসিনা ভায়া ম. খা. আলমগীর
টু মুরাদ জং-সোহেল রানা। ফ্রম পিলখানা টু সাভার—সব ঘটনাই এই একই
অন্তর্নিহিত দেউলিয়াত্বের কদর্য মর্মান্তিক বিকাশ। তাই দৃঢ়ভাবে বলা চলে,
সাভার ট্র্যাজেডি অপরিকল্পিত হলেও ছিল অবধারিত, অভাবনীয় হলেও ছিল
অবশ্যম্ভাবী।
সোজা কথায়, আওয়ামী সরকার ও দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সৃষ্ট ও চর্চিত নীতি
হত্যার কালচার সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত অবাধে গড়িয়ে গিয়ে রূপান্তরিত হয়েছে
মানুষ হত্যার কালচারে। আরো সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়, এই আওয়ামী সরকার,
হত্যাকারী সরকার। বিবেচনা করুন, সাভার হত্যাকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী
নেত্রী-নেতাদের সংশ্লিষ্টতার পরিমাণ। বিবেচনা করুন, এসব খল নায়িকা-নায়করা
২৪ এপৃল ২০১৩-তে কি করেছিলেন।
২৪ এপৃল সকালে বিএনপি নেতা-কর্মীরা
বুধবার ১১ বৈশাখে ছিল নির্মেঘ আকাশ। সকাল থেকে রোদে ঝলসে যাচ্ছিল রাজধানী
ঢাকা এবং প্রায় পনের মাইল দূরে সাভার শিল্প এলাকা। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি
আহূত দুইদিন ব্যাপী ছত্রিশ ঘণ্টা হরতালের এটা ছিল দ্বিতীয় দিন। পথে
প্রাইভেট কার, কোচ ও লরির সংখ্যা কম থাকলেও ছিল রিকশা, সিএনজি, কিছু সরকারি
ও বেসরকারি বাস। অধিকাংশ দোকানপাট ছিল বন্ধ। সরকারি অফিস ছিল খোলা। কিছু
প্রাইভেট অফিসে ছিল সীমিত সংখ্যক স্টাফ। এই হরতাল শেষ হবার কথা ছিল বিকেল
ছ’টায়। তারপর হতো নিয়ম মাফিক বিরোধী দলের প্রেস কনফারেন্স, সরকারি দলের
দাবি “হরতাল অসফল” এবং আওয়ামী মিডিয়ার প্রচার “হরতাল ঢিলেঢালা”।
সেদিন সকালে বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যরা এবং নেতা-কর্মীরা ভাবছিলেন
ছত্রিশ ঘন্টার হরতাল শেষে কিভাবে তাদের আন্দোলন চলমান রাখা সম্ভব হবে?
পরবর্তী সপ্তাহে আরো হরতাল? কোন যুক্তিতে? ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ কি সেসব
যুক্তি বুঝবে? মেনে নেবে? এসব চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছিল বিএনপি নীতি
নির্ধারকদের মনে।
২৪ এপৃল সকালে সোহেল রানা
সেদিন সকালে বিপরীত চিন্তাধারায় চলছিলেন সাভারের এমপি তালুকদার তৌহিদ জং
মুরাদ ও তার স্নেহধন্য স্থানীয় যুব লীগ নেতা রানা প্লাজার মালিক সোহেল
রানা। তারা ভাবছিলেন সেদিনের হরতাল কিভাবে ব্যর্থ করা যায়। তাদের দুজনারই
আরো একটি মিশন ছিল। তারা ভাবছিলেন কিভাবে সরকারের ইংগিতে কতিপয় এনজিও আহূত
শনিবার ২৭ এপৃলে মতিঝিল ও প্রেস ক্লাবের সামনে নারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের
সম্মেলনে সাভারের বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে নারী শ্রমিকদের নেয়া
যাবে। হেফাজতে ইসলামি-র তের দফা দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এবং
হেফাজতে ইসলাম আহূত আসন্ন ৫ মে “ঢাকা অবরোধ” কর্মসূচির বিরুদ্ধে শক্তি
দেখাতে সরকারের চাপে ঢাকায় নারী গার্মেন্টস কর্মীদের সম্মেলন ডাকা হয়েছিল।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছিল, আওয়ামী সরকার গার্মেন্টস মালিকদের ওপর
প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার তাদের হুমকি দিয়েছে ২৭ এপৃল যদি নারী
গার্মেন্টস কর্মীদের সম্মেলন বিশাল না হয় তাহলে হাতির ঝিলে বিজেএমইএ-র
বিতর্কিত ভবনটি ভেঙ্গে ফেলা হবে।
রানা প্লাজার মালিক সোহেল জানতেন আগের দিন অর্থাত্ মঙ্গলবার ২৩ এপৃলে ওই
ভবনের তৃতীয় তলায় ফাটল দেখা গিয়েছিল। সেজন্য শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে চান
নি। সোহেল রানা জানতেন ভবনের দোতলায় ব্র্যাক ব্যাংকের ব্রাঞ্চ অফিস
মঙ্গলবারে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভবনে ফাটলের খবর পেয়ে মঙ্গলবারেই সাভার
থানার ওসি আসাদুজ্জামান পুলিশের একটি দল নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। তারা ভবনের
প্রতিটি ফ্লোর পরীক্ষা করে সব ফ্লোর খালি করে দেন। এতে সোহেল রানা ক্ষুব্ধ
হন। ওসি আসাদুজ্জামান নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি সোহেল রানাকে
নির্দেশ দেন উপযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ইনসপেকশনের আগে ভবনের ভেতরে যেন কেউ
না ঢোকে।
এরপরে রানা প্লাজাতে আসেন ইউএনও। সোহেল রানা তাকে “ম্যানেজ” করেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে রানা প্লাজাতে এসে হাজির হন সোহেলের কয়েকজন বন্ধু। ওই
ভবনে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকপক্ষের লোকজনকে ডেকে আনেন সোহেল রানা।
তিনি মালিকপক্ষকে বলেন, “ওরা ইঞ্জিনিয়ার। ভালোভাবে ভবন পরীক্ষা করেছে। একশ
বছরেও ভবনের কিছু হবে না। কোনো ভাবেই গার্মেন্টস বন্ধ রাখা যাবে না।
হরতালের দিন গার্মেন্টস বন্ধ রাখলে নেগেটিভ ইমপ্যাকট পড়বে। তাই গার্মেন্টস
খোলা রাখতে হবে।” এই হুমকি দেয়ার সময়ে ইউএনও উপস্থিত ছিলেন। (মানবজমিন
২৮.০৪.২০১৩)
হুমকি যেন ফলপ্রসূ হয় সেটা নিশ্চিত করতে বুধবার ২৫ এপৃল সকালেই রানা
গিয়েছিলেন তার ভবনে। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন হরতাল বিরোধী মিছিলের জন্য একদল
মাস্তান যারা আগের দিনেও গিয়েছিল। সকাল থেকে এদের সঙ্গে প্লাজার বেইসমেন্টে
রানা মিটিং করছিলেন। ওই সময়ে ভবন ধস শুরু হয়। রানা সেখান থেকে ছুটে বেরিয়ে
যেতে পারেন। কিন্তু নয়তলা প্লাজার অন্যরা রানার মতো লাকি ছিলেন না। বিকট
শব্দে রানা প্লাজা পেছনের দিকে হেলে গিয়ে ধসে পড়ে পেছনের একটি বাড়ির ওপর।
প্লাজার এক তলা থেকে ছয় তলা পর্যন্ত একাকার হয়ে যায়। সাত, আট ও নির্মীয়মাণ
নয় তলায় ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ কম হয়। বিধ্বস্ত রানা প্লাজায় আহতদের
চিত্কারের সঙ্গে যখন মিশে যেতে থাকে কংকৃটের ধুলাবালি তখন সোহেল রানা গিয়ে
আশ্রয় নেন তার রাজনৈতিক মুরুব্বির কাছে।
২৪ এপৃল সকালে নতুন রাষ্ট্রপতি
সেদিন সকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে সদ্য প্রমোটেড স্পিকার আবদুল
হামিদের মন ছিল দুঃখ ও আনন্দে মেশানা। দুঃখ ছিল এই কারণে যে, তার ছোট ভাই
আবদুর রাজ্জাক দুদিন আগে সোমবার ২২ এপৃলে পিজি হসপিটালে পরলোকগমন করেছিলেন।
তার মরদেহ মর্গে ছিল এবং স্থির হয়েছিল বুধবার ২৫ এপৃলে মিঠাইমনের
কামালপুরে গ্রামের বাড়িতে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে।
বুধবার ২৪ এপৃল সকালে আবদুল হামিদের মনে অনেক আনন্দও ছিল। কারণ শেখ হাসিনার
বান্ধবী সৈয়দা সাজেদা হোসেন ও কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে হতাশ করে
সেদিনই সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি পদে বঙ্গভবনে তিনি শপথ নেবেন। আওয়ামী লীগ ও তার
সহযোগী রাজনৈতিক দলের নেতারা, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীরা, ডিপ্লম্যাটরা,
সবাই আসবেন বঙ্গভবনে। শপথ গ্রহণের পর খানাপিনা হবে। সেই প্রস্তুতি সেখানে
চলছিল। আবদুল হামিদ সেই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। তিনি একটি ধোপ দুরস্ত কালো
বঙ্গবন্ধু কোট এবং পায়জামা-পাঞ্জাবি রেডি রেখেছিলেন। এ সবের পাশাপাশি আবদুল
হামিদের স্টাফরা যোগাযোগ রাখছিলেন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। কারণ
শপথ গ্রহণের পরদিন সকালে হেলিকপটারে নতুন রাষ্ট্রপতি প্রথমেই যাবেন
টুঙ্গিপাড়াতে শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে তার শ্রদ্ধা নিবেদন করতে।
তারপর তিনি যাবেন কিশোরগঞ্জ কামালপুরে তার ভাইয়ের জানাযায় অংশ নিতে। বুধবার
২৪ এপৃল সকালেই আবদুল হামিদ খবর পেয়েছিলেন সাভারে রানা প্লাজায় বহু মানুষ
হতাহত হয়েছে।
যেহেতু রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের জ্ঞান শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ এবং
তার নিজের নির্বাচনী এলাকা ও তার নিজ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সেহেতু
তিনি জানতেন না সাভারের চাইতে বিদেশে অনেক ছোট দুর্ঘটনায় রাষ্ট্রপতিরা
তাত্ক্ষণিকভাবে ছুটে গিয়েছেন অকুস্থলে। যেমন, অক্টোবর ২০১২-তে হারিকেন
স্যান্ডি যখন নিউ ইয়র্কে আঘাত হানে তখন প্রেসিডেন্ট ওবামা তার নির্বাচনী
ক্যামপেইন ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন উদ্ধার কাজে অংশ নিতে। যেমন এপৃল ২০১৩-তে
বস্টন ম্যারাথন দৌড়ে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলার সংবাদে প্রেসিডেন্ট ওবামা
ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। যেমন, ৫ আগস্ট ২০১০-এ কোপিআপো, উত্তর চিলিতে একটি
খনি ধসে ২,৩০০ ফিট নিচে ৩৩ খনি শ্রমিক আটকে পড়লে প্রেসিডেন্ট পিনেরা বিদেশে
সফর ফেলে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। ৬৯ দিন পরে আটক সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা
হয়। যেমন, ৭ জুলাই ২০০৫-এ লন্ডনে পাতাল রেলপথের তিনটি অংশে সন্ত্রাসীদের
বোমা বিস্ফোরণে আটকে পড়েছিল শত শত অফিসযাত্রী। এই রেলপথগুলোর একটি অংশ ছিল
১০০ ফিট গভীরে। অকুস্থলে ছুটে গিয়েছিলেন তদানীন্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী।
এই জাতির চরম দুর্ভাগ্য যে বর্তমানে ক্ষমতার শীর্ষে যারা আছেন তাদের জ্ঞান
টুঙ্গিপাড়া ও শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ইতিহাসে সীমাবদ্ধ। তারা জানেন না
লন্ডন, কোপিআপো, বস্টন, নিউ ইয়র্ক কোথায়? তারা জানেন না অন্য দেশের
রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরা দুর্যোগে-দুর্ঘটনায় কি করেন। ‘জয় বাংলা’,
‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান উত্সাহী এই দেশের নেতাদের চরম অজ্ঞতা ও নিষ্ঠুর
অবহেলার শিকার হচ্ছে এই বাংলারই মানুষ এবং সেই সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের
স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ।
২৪ এপৃল সকালে প্রধানমন্ত্রী
বুধবার ২৪ এপৃল সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাবছিলেন কোন পোশাকে তিনি
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যাবেন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে নতুন ধরনের ডিজেল
ইলেকটৃক মালটিপল ইউনিট (ডিএমইউ) ট্রেন উদ্বোধন করতে। সাধারণত তিনি চেষ্টা
করেন সময় এবং অনুষ্ঠানের সঙ্গে ম্যাচিং পোশাক পরতে। ১৯৯৬-এর জুন-জুলাইয়ে
নির্বাচনের আগে তাকে দেখা যেত হিজাব-তসবিহ ও ফুল স্লিভ ব্লাউজ পরতে।
নির্বাচনে জয়ী হবার সেই পোশাকে তাকে আর দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন সময়ে তাকে
সামরিক ও বেসামরিক পোশাকে দেখা গিয়েছে। সেদিন বুধবার সকালে তিনি বেছে নেন
শাদা জমিনে সবুজ কাজ করা জামদানি শাড়ি যার আনুমানিক দাম হতে পারে বিশ হাজার
টাকা। এর বিপরীতে পাঠকরা বিবেচনা করতে পারেন রানা প্লাজায় হতাহত নারী
গার্মেন্ট শ্রমিকদের পরনে কি ছিল। তাদের পরনে ছিল সবচেয়ে শস্তা প্রাইড অথবা
জনি পৃনটার্সের শাড়ি। সবচেয়ে শস্তা সালওয়ার কামিজ। এই বাংলাদেশে যারা
ক্ষমতা ও সমাজের শীর্ষে আছেন, তাদের সঙ্গে শ্রমজীবনের সবচেয়ে নিচে যারা
আছেন, তাদের মধ্যে তফাত্ কতো লাইট ইয়ার্স? এই পার্থক্য কতো ভালগার? কতো
অসহ্য অশ্লীল?
এই ট্রেন উদ্বোধনের সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “জনগণকে এই সম্পদ
রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে।... বিরোধী দলের আন্দোলন মানেই মানুষ হত্যা।
এরা পাকিস্তানিদের মতো মানুষ হত্যা করছে। ইট দিয়ে মাথা থেতলে মানুষ হত্যা
করছে। কি জঘন্য তাদের মনোবৃত্তি! ... হরতাল ডাকছেন। এটা আপনাদের অধিকার।
কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায়—তাদের কি সুবিধা হচ্ছে? উত্পাদিত পণ্য তো
বাজারজাত হচ্ছে না।.
.. এরা হরতাল ডেকে এয়ারকনডিশন্ড ঘরে মুরগির ঠ্যাং চিবান আর সিনেমা দেখেন।” (আমাদের অর্থনীতি ২৫.৪.২০১৩)
এসব মন্তব্যের সময়ে শেখ হাসিনা ভুলে যান ১৯৯৬-এ বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে
চট্টগ্রামে নতুন নির্মিত গোটা রেলস্টেশনই পুড়িয়ে দিয়েছিল আওয়ামী
হরতালকারীরা। কেন? তারা তখন আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার
দাবি করছিলেন। শেখ হাসিনা এখন ভুলে গিয়েছেন কেন সেই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর
পাশাপাশি আন্দোলনে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করছিল।
শেখ হাসিনা হয়তো ভুলে গিয়েছেন চট্টগ্রামে যখন রেলওয়ে স্টেশন পুড়ছিল তখন
তিনি কি খাচ্ছিলেন? গরু, খাসি অথবা মুরগির ঠ্যাং?
প্রধানমন্ত্রী জঘন্য ভাষার সিনড্রোমে ভুগছেন? একই সঙ্গে দুর্বল
স্মৃতিশক্তির সিনড্রোমেও ভুগছেন। এই ধরনের ভাষা নিয়তই যার মুখ নিঃসৃত হয়
তিনি কোনো সম্মানিত ব্যক্তি হতে পারেন না। তিনি মাননীয় হতে পারেন না।
কমলাপুর স্টেশনেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে খবর পান সাভার দুর্ঘটনার। কিন্তু তিনি সেখানে যাননি।
দুপুরে প্রধানমন্ত্রী যান সংসদ অধিবেশনে। ইতিমধ্যে সাভার দুর্ঘটনার আরো
কিছু খবর তার কাছে পৌঁছায়। শেখ হাসিনা বলেন, “এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমরা
গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার ২৫ এপৃলে জাতীয়
শোক দিবস ঘোষণা করা হচ্ছে।... উদ্ধার কাজে দুই একদিন লাগবে।... হরতালের
কারণে অনেক ক্ষতি হওয়ায় ছুটি দেয়া হবে না। কিন্তু সব জায়গায় জাতীয় পতাকা
অর্ধনমিত থাকবে।... হরতালের কারণে উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটছিল। কিন্তু
বিরোধী দল হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক সুবিধা
হচ্ছে। তাই বিরোধী দলকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
ওদের স্থান মাটির নিচে
শেখ হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম বিরোধী দলের প্রতি সৌজন্যসূচক কিছু বললেন। কেন?
আসলে তিনি বিরোধী দলের হরতাল ডাকার প্রতি কটাক্ষ করতে চেয়েছিলেন। সত্যটা
হচ্ছে এই যে, সেদিন হরতালের ফলে সকালে ট্রাফিক চলাচল কম ছিল এবং সেজন্য
ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত সাভারে পৌঁছাতে পেরেছিলেন।
হরতালের কারণে রানা প্লাজার শপিং মলে কিছু দোকান বন্ধ থাকায় হতাহতের সংখ্যা
কিছু কম হয়েছে।
তবে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণায় দুপুরের মধ্যে সাভারে সমবেত উদ্বিগ্ন মানুষের
মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। আর শোকের দিনে ছুটি না দেয়ার প্রসঙ্গে সবারই
মনে পড়ে যায় আওয়ামী সরকারের আমলে প্রতি বছরের পনেরই আগস্টে শোক দিবস পালিত
হয় এবং ছুটিও দেয়া হয়।
বাংলাদেশে শুধু একজনের মৃত্যুর ক্লাস উচুতে এবং সংরক্ষিত। সেই মৃত্যু নিয়ে
চলে শোকের মাস এবং আওয়ামী মাতম। অন্য কোনো ঘটনায় এক দিনে এক হাজার মানুষের
মৃত্যুর ক্লাস একেবারেই আলাদা। তাই সাভারে মৃত্যুর ক্লাস আলাদা এবং সবচেয়ে
নিচে। ওরা জনগণ (শেখ হাসিনারই অতি ব্যবহৃত শব্দ)। ওদের স্থান মাটিতে এবং
এখন ওদের স্থান মাটির নিচে।
সেদিন সংসদে শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসে পড়ার বিশ মিনিটের মধ্যে
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং সেনাবাহিনী উদ্ধারকাজ শুরু করে।
বিশ্বের ইতিহাসে এত দ্রুত কেউ উদ্ধারকাজ করেছে কিনা, তা বলতে পারবে না।’
বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে বিলম্বিত
সরি। বিশ্বের ইতিহাসে এর চেয়ে অনেক দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে এবং জীবিত ও
অক্ষত অবস্থায় মানুষ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত মানুষের পঙ্গুত্বকে রোধ করা
সম্ভব হয়েছে। ব্রিটেন, চিলি ও আমেরিকার যে চারটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে,
সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পড়ে দেখতে পারেন।
বস্তুত সাভার দুর্ঘটনায় অদক্ষভাবে যে উদ্ধারকাজ পরিচালিত হয়েছে, সেটা বিশ্ব
ইতিহাসে সবচেয়ে বিলম্বিত রূপে পরিগণিত হবে। এই বিলম্বের ফলে এবং
উদ্ধারকাজে আওয়ামী সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে অসংখ্য হতভাগ্য এখন
পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন।
বিদেশি সাহায্য নেয়নি
আওয়ামী সরকারের এই হঠকারিতা আজকের লন্ডনের দৈনিক পত্রিকা দি ডেইলি টেলিগ্রাফ-এ প্রকাশিত হয়েছে। পড়ুন :
গত বুধবারে রানা প্লাজা ধসে ইট-সিমেন্ট-সুরকির একটি বিরাট ধ্বংসস্তূপে
পরিণত হয়। এতে মারা গেছে ৩৭০ জনেরও বেশি। স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলোর কাছে
উপযুক্ত সরঞ্জাম ছিল না। তারা কোনোক্রমে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে মানুষ বের করার
চেষ্টা করছিল।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিদেশিরা অভিজ্ঞ উদ্ধারকারীর দল পাঠানোর
প্রস্তাব দিয়েছিল। এর ফলে হয়তো অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচত। দ্য ডেইলি
টেলিগ্রাফ যেসব ডকুমেন্ট দেখেছে, তাতে বোঝা যায়, বিদেশিদের ওই প্রস্তাব
নাকচ করে দিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র
মন্ত্রণালয়। তারা আশঙ্কা করেছিল, বিদেশি সাহায্য নিলে জাতীয় গর্ব ক্ষুণ্ন
হবে। এসব ডকুমেন্ট জানিয়েছে, বিদেশিরা তাদের সাহায্য নিতে বারবার অনুরোধ
করেছিলেন বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের। এমনকি বিদেশিরা এটাও বলেছিলেন, বিষয়টিতে
বাংলাদেশ সরকারের স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে তারা নিজেদের উপস্থিতি লো
প্রোফাইলে (যথাসাধ্য কম দেখিয়ে) রাখবেন।
যখন জাতিসংঘের কর্মচারীরা বোঝেন যে ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ চাপা
পড়েছে, তখন তারা পশ্চিমি ডিপ্লম্যাটদের নিয়ে মিটিং করেন। তারা বিবেচনা করেন
এত বড় দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামর্থ্য আছে কিনা। তারা সবাই একমত
হন যে সেই সামর্থ্য নেই। তখন তারা বৃটেনসহ বহু দেশের সরকারের কাছে আবেদন
করেন, তারা যেন উদ্ধারকারীদের এবং হেভি লিফটিং ইকুইপমেন্ট (ভার উত্তোলনের
ভারী যন্ত্র) পাঠান।
জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা বলেন, বৃটেনসহ আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ধ্বংসস্তূপে
তল্লাশি এবং উদ্ধার কাজে সাপোর্ট দিতে চেয়েছিল, কিন্তু এই প্রস্তাব নাকচ
করে দেয়া হয়।
পরিবর্তে উদ্ধারকাজে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর নির্ভর করা হয়। যাদের
কোনো প্রটেকটিভ ক্লোদিং (নিরাপত্তামূলক বুট, পোশাক ও হেলমেট) ছিল না। তাদের
পায়ে ছিল প্লাস্টিক স্যানডাল! এক শ্রমিককে বাচানোর জন্য তার হাত কেটে যখন
ফেলতে হয়, তখন সেটা উপস্থিত কোনো ডাক্তার করেননি। বরং হাত কাটতে ডাক্তাররা
নির্দেশ দেন অন্য আরেক শ্রমিককে!
আগেভাগেই উদ্ধার কাজ শেষ করার চেষ্টা সরকার করেছে, এমন সমালোচনা এসেছে
সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারি কর্মচারীরা বলেছিলেন, ৭২ ঘণ্টার বেশি কেউ বাচবে
না। এই বলে তারা হেভি যন্ত্রগুলো সরিয়ে ফেলার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু
উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনদের তীব্র ক্ষোভের মুখে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়।
তারপর যখন আরো মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, তখন জনতা তাদের দাবি আরো
জোরালো করে। তারা বলে আরো মানুষকে জীবিত পাওয়া যাবে।
বৃটিশ সরকারের ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি)-এর
জনৈক মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, তারা যে ‘স্পেশালিস্ট টেকনিকাল এডভাইস’ দিতে
চেয়েছিলেন সেটা বাংলাদেশ সরকার নাকচ করে দিয়েছে।”
এই হলো দি ডেইলি টেলিগ্রাফের রিপোর্ট।
কিন্তু প্রশ্ন ওঠে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিসের জন্য গর্ব করেন?
নিজেদের বংশমর্যাদা? সেটা কি খুব বেশি? দুই পুরুষ পিছনে তাকিয়ে দেখুন। উত্তরটা পাবেন।
আভিজাত্য? নিজেদের ভাষা ও চালচলন প্রকৃত অভিজাতদের সঙ্গে তুলনা করুন। উত্তরটা পাবেন।
শিক্ষা? বাজারে কেনা অনারারি ডক্টরেট এবং খালখননের ডক্টরেটের বিপরীতে বিবেচনা করুন ড. ইউনূসের ডক্টরেট। উত্তরটা পাবেন।
জ্ঞান? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং চিলিয়ান প্রেসিডেন্ট পিনেরা-র সঙ্গে তুলনা করুন। উত্তরটা পাবেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এই অজ্ঞ, অপদার্থ এবং অহমিকাপূর্ণ শাসকদের গর্ব নয়, ফুটানি-র জন্য রানা প্লাজায় কত মানুষ মারা গেল?
হয়তো এত মানুষ মারা যেত না। যদি সেই সকালে রানা প্লাজায় একটি বিশেষ পরিবারের কোনো সদস্য চাপা পড়তেন।
১৯ জুলাই ৬৪ খৃষ্টাব্দে গোটা রোম শহরে আগুন লেগেছিল। ছয় দিন জুড়ে সেই আগুনে
রোম পুড়েছিল। কথিত আছে সেই সময়ে রোমের অত্যাচারী সম্রাট নিরো মঞ্চনাটকের
পোশাক পরে গান গেয়েছিলেন এবং বাশি বাজিয়েছিলেন। অন্য একটি সূত্রের মতে নিরো
এক ধরনের হার্প লায়ার বাজিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে সাভারে রানা প্লাজা যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল, তখন শাসক কোথায় ছিলেন তা জানানো হয়েছে।
ট্রেনে আনন্দ ভ্রমণে, জয়রাইডে।
3.
বর্তমান
আওয়ামী সরকারের আমলে যে বারোটি বিশাল মানবিক বিপর্যয়ে বহু মানুষ প্রাণ
হারিয়েছে এবং বিরাট আর্থিক বিপর্যয়ে বহু মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়েছে সেসব
ঘটনার পেছনে কোন আওয়ামী মন্ত্রী-নেতারা সম্পৃক্ত ছিলেন তার কিছু বিবরণ জানা
গেছে। তারা নেপথ্যেই থাকতে চেয়েছেন। সামনে ঠেলে দিয়েছেন তাদের
ফ্রন্টম্যানদের। এই ফ্রন্টম্যানদের বহন করতে হয়েছে সমাজের ধিক্কার, মিডিয়ার
সমালোচনা এবং পুলিশের রিমান্ড ও জেল।
যেমন ডেসটিনির আর্থিক কেলেংকারিতে ওই গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, সেক্টর কমান্ডার
ও সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. হারুন-অর-রশিদ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু
জেলে গিয়েছেন ওই গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। যেমন,
হলমার্কের আর্থিক কেলেংকারিতে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও প্রধানমন্ত্রীর
উপদেষ্টা ড. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী নিরাপদে আছেন। কিন্তু জেলে গিয়েছেন এই
গ্রুপের কর্ণধার তানভির মাহমুদ তফসির। যেমন, সর্বশেষ মানবিক বিপর্যয়ে
সাভারের আওয়ামী এমপি মুরাদ জংয়ের বিরুদ্ধে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে
সার্বিক প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ উঠলেও তিনিও নিরাপদে আছেন। কিন্তু সোহেল
রানা হাজতে আছেন।
এই ফ্রন্টম্যানদের হয়তো কিছু শাস্তি ভোগ করতে হবে। তবে আওয়ামী লীগ যদি আবার
সাধারণ নির্বাচন ম্যানেজ করে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে তাহলে তারা লঘু দণ্ড
ভোগ করবেন।
বিস্ময়কর সব উত্থান
আওয়ামী রাজনীতির ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, আইন প্রতিমন্ত্রী
কামরুল ইসলাম এবং স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী (যিনি আগে এমপি ছিলেন না
এবং এখনো নির্বাচিত এমপি নন) প্রমুখের উত্থানের মতোই আওয়ামী ব্যবসা
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রফিকুল আমীন, তানভির মাহমুদ এবং সোহেল রানার উত্থান
ঘটেছে বিস্ময়কর দ্রুতগতিতে। উল্কার মতো এদের আবির্ভাব এবং আলাদিনের দৈত্যের
মতো এদের বিশাল আকার ধারণে আওয়ামী পত্রিকা, টিভি বিব্রত হয়েছে। তাই এদের
উত্থান কিভাবে ঘটলো সে বিষয়ে বিস্তারিত খবর প্রকাশে তারা কুণ্ঠিত থেকেছে।
তারপরেও সাভার দুর্ঘটনার প্রধান হোতা ও ফ্রন্টম্যান সোহেল রানার উত্থান
বিষয়ে কিছু পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। এসব খবরের সারাংশ হলো—
সাভারে সোহেল রানার পরিচয় খালেক কলুর ছেলে এবং হঠাত্ গজিয়ে ওঠা যুবলীগ নেতা
হিসেবে। আদি বাড়ি মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্ডপ গ্রামে। দুই দশক
আগে আবদুল খালেক কলু জয়মন্ডপ গ্রাম ছেড়ে সাভার বাজারে ভাসমান মানুষ হিসেবে
আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি ঘানিতে সরিষার তেল ভাঙ্গিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি
করতেন। সাভার বাজারের সেই ভাসমান ঘরের সন্তান সোহেল রানা সন্তানের জন্মের
পর কলু খালেক একটি নাদুস নুদুস শিশু দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। ওই সময়ে
বাংলাদেশে মুভির বড় নায়ক ছিলেন সোহেল রানা। সম্ভবত কলু খালেক ছিলেন তার
ভক্ত। তাই তিনি নবজাত শিশুর নাম রেখেছিলেন সোহেল রানা। তবে তিনি তখন
কল্পনাও করতে পারেন নি তার পুত্রধনটি হবে নায়ক সোহেল রানার চাইতে অনেক বেশি
খ্যাতিমান ও ধনবান।
এক সময় সোহেল রানা তার বাবার তেলের ঘানিতে কাজ করতো। বোতলে ভরে সরিষার তেল
বিক্রি করতো পায়ে হেঁটে। একটা বাইসাইকেল কেনার সামর্থ্য তার ছিল না। তাদের
বাড়িটিকে এখনো স্থানীয়রা কলুর বাড়ি হিসেবেই জানে।
সোহেল সাভার অধরচন্দ্র হাইস্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল। এরপর
পড়াশোনা এগোয়নি তার নিজের উচ্ছৃঙ্খলতা এবং পিতার দারিদ্র্যের কারণে। কিন্তু
সোহেল রানা এগিয়ে গিয়েছিল ছাত্র রাজনীতিতে। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই
রানা ঢুকে পড়ে রাজনীতি আশ্রিত সন্ত্রাসী রাজীব-সমর বাহিনীতে। সাভারের ঝুট
ব্যবসায়ে হাত লাগিয়ে বিত্তের মালিক হতে থাকে। এক সময়ে সে হয় সাভার উপজেলা
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
দু’তিন বছরের মধ্যে সোহেল রানা রূপান্তরিত হয় মানি মেশিনে। অর্থাত্ টাকা
উত্পাদনের যন্ত্রে। প্রথমে সোহেল রানা একটি তেলের মেশিন বসায়। নাম দেয় রানা
অয়েল মিল। গোলাপ ফুল মার্কা সেই তেল সাপ্লাই করা হয় সাভার থেকে রাজধানী
ঢাকা পর্যন্ত।
১৯৯৮-এ সোহেল রানার নজরে পড়ে স্থানীয় রবীন্দ্রনাথ সাহার জমি। তখন আওয়ামী
লীগ ক্ষমতায়। সোহেল রানা দখল করে রবীন্দ্র সাহার জমি। সেখানে ডোবার ওপরে
রানা প্লাজা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ওই বছরেই। রবীন্দ্র সাহা মামলা করলেও
সে মামলা আদালতে বেশি দূর এগোয়নি। সাভারে গড়ে ওঠে সোহেল রানার সন্ত্রাসী
চক্র। সে পরিচিত হয় ভয়ংকর ভূমিদস্যু রূপে। সাভারে উঠতে থাকে সোহেল রানার
ভবন। প্রথমে নয় তলা রানা প্লাজা। তারপর নয় তলা রানা টাওয়ার। তারপর তার
নিজের পাঁচতলা বাসভবন। সাভার পৌর এলাকায় আড়াই একর জমি। পৌরসভার বাইরে ষোল
একর জমি। একটি পত্রিকার হিসাবে এসব বাড়ি, সম্পত্তি ও নগদ ক্যাশসহ সোহেল
রানা হন ৫০০ কোটি টাকার মালিক। এক সময়ে বাইসাইকেল বিহীন রানার পরিবারের ছিল
তিনটি মোটর গাড়ি এবং তার নিজের চলাফেরার জন্য একটি প্র্যাডো।
রাজনীতির আড়ালে সাভারের মাদক ব্যবসা, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রথমে
নিজের বাহিনী দিয়ে চুরি করানো, পরে চাঁদাবাজি, এবং পরিচিতি বেড়ে যাওয়ার পর
জোর করে জমি দখল, বিশেষত হিন্দু সম্পত্তি দখল করে প্রথমে নিজের নামে লিখে
নিয়ে এবং পরে শিল্পপতিদের কাছে বিক্রি করে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল
বিত্তশালী হয়ে যায় সোহেল রানা।
কলু থেকে কোটিপতি
ইংরেজিতে একটা বাক্য আছে, ফ্রম র্যাগস টু রিচেস (ঋত্ড়স ত্ধমং ঃড় ত্রপযবং)
যা দিয়ে বর্ণনা করা হয় সেই সব ব্যক্তিদের যারা চূড়ান্ত অভাব অনটন থেকে
যাত্রা শুরু করে বিশাল ধন সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। ফ্রম র্যাগস টু
রিচেস—অনুপ্রাসটি লক্ষ্য করুন। সাভারের সোহেল রানার উত্থানে বাংলায়
অনুপ্রাস হয়েছে কলু থেকে কোটিপতি!
গরিব থেকে ধনী হওয়াটা নিন্দনীয় নয়। বরং খুবই প্রশংসনীয় যদি সেই যাত্রাপথ হয়
বৈধ। এতে সেই নব্য ধনীর উদ্যোগ, উদ্যম, বুদ্ধি ও পরিশ্রমের প্রমাণ পাওয়া
যায়। তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে মানুষ উদ্বুদ্ধ হতে পারে। আরো মানুষ গরিব
থেকে ধনী হতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশ আরো উন্নত হতে পারে। কিন্তু চরম
দারিদ্র্য থেকে প্রচুর বিত্ত—এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথটি যদি হয় অবৈধ তাহলে
সরকার ও সমাজকে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা ও অবস্থান নিতে হবে। নতুবা
বিত্তের লোভে সেই ব্যক্তির অপরাধকে অন্যরা অনুসরণ করতে থাকবে। অপরাধই তখন
হবে ব্যক্তিগত সাফল্যের মূলমন্ত্র যার পরিণতিতে তখন ঘটতে থাকবে ডেসটিনি,
হলমার্ক, রানা প্লাজার মতো একটার পর একটা সামষ্টিক দুর্ঘটনা।
চুমুর পোস্টার
সোহেল রানা বুঝেছিলেন ধনী হবার জন্য আওয়ামী এমপি মুরাদ জংয়ের রাজনৈতিক
কর্মে সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে। তাই বিএনপি আহূত হরতালের দিনে সকাল বেলাতে
তার মাস্তান বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন রানা প্লাজাতে।
শ্রমিকদের বাধ্য করেছিলেন ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে। দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া
একাধিক শ্রমিক বলেছেন, তারা ভবনে যেতে না চাইলে, রানা বলেছিলেন ভবনে কিছু
হয়নি, কেবল প্লাস্টারে ফাটল ধরেছে।
সাভারের তিনটি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উচ্চারিত হয় সোহেল রানার নাম—যদিও কাগজে
কলমে কোন অভিযোগ ছিল না। সোহেল রানার শক্তি ছিল তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক
স্থানীয় আওয়ামী এমপি তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদ। সাভার বাজারে স্থায়ীভাবে
লাগানো হয় মুরাদ জং-সোহেল রানার যুগল ছবিসহ টেকনিকালার শত শত পোস্টার।
প্রকাশিত হয় রানাকে জড়িয়ে ধরে মুরাদ জংয়ের চুমু খাওয়ার দৃশ্য। এ চুমু
পারস্পরিক প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। এ চুমু ছিল উভয়ের ক্ষমতা ও বিত্তের
প্রতি দুর্দমনীয় লোভের প্রকাশ এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বিজ্ঞাপন।
সপ্তাহে দু’একদিন সাভারে যেতেন মুরাদ জং। তার সামনে পেছনে থাকতো পুলিশের
ভিআইপি প্রটোকল। এছাড়া থাকতো তিন-চারশ মোটরবাইক। আর সার্বক্ষণিকভাবে থাকতো
রানা বাহিনী। একটি পত্রিকা জানায় ‘মুরাদ জং মিরপুরে বাস করে রানার মতো লোক
দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন সাভার-আশুলিয়ার ঠিকাদারি কাজ, শিল্প-কারখানার
চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, জমি রেজিস্টৃ বাণিজ্য, কমিশন আদায়,
টিআর-কাবিখা-ওএমএস সহ তার রাজনীতি।’
একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে (জুলাই
১৯৯৬-সেপ্টেম্বর ২০০১)। তখন, ফেনী, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার কিছু
আওয়ামী এমপি জাতীয় সন্ত্রাসের প্রতীক হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার ছয়দিন পরে উদ্ধার কাজ দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন সাভারে
গিয়েছিলেন তখন মুরাদ জং তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর
রক্ষকদের বাধায় মুরাদ জং কাছে ঘেসতে পারেন নি। কিন্তু কেন? মুরাদ জং কি
ইনফেকশাস? সংক্রামক? এলাকায় গিয়ে স্থানীয় এমপির সঙ্গেই তো সবচেয়ে প্রথমে
দেখা করা এবং বিস্তারিত কথা বলা উচিত ছিল প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু সোহেল
রানা যে ফটো অপরচুনিটির সুযোগ নিয়েছিলেন সেই সুযোগ প্রধানমন্ত্রী দিতে চান
নি মুরাদ জংকে। তবে দুর্ঘটনার প্রথম দিনেই প্রধানমন্ত্রী যেমন সংসদে তার
ভাষণে যুব লীগের সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্তি দ্বিধাহীন কণ্ঠে অস্বীকার
করেছিলেন তেমনটা তিনি মুরাদ জংয়ের বেলায় এখনো করেন নি। প্রধানমন্ত্রী
বলেননি, মুরাদ জং আওয়ামী লীগের এমপি নন।
প্রসঙ্গত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি অনেকেই সতর্কবাণী দিচ্ছেন। তারা
বলছেন, মুরাদ জংয়ের মতো কোন ব্যক্তি যেন আগামীতে কোন নির্বাচনে বিএনপির
মনোনয়ন না পায় সে বিষয়ে খালেদাকে এখন থেকেই সাবধান ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থকাতে
হবে।
সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগে কমফর্টেবল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেন, ‘ক্ষমতায় এলে সবাই সরকারি দলের হয়ে
যায়।’ তার এই কথা সত্য। তবে এটাও সত্য যে এই ধরনের রূপান্তরিত সন্ত্রাসীর
সংখ্যা আওয়ামী লীগেই বেশি ভীড় জমায়, কারণ তারা সেখানে বেশি কমফর্টেবল ফিল
করে। আর তার কারণ হচ্ছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে বিরাজমান সন্ত্রাসী
মনোভাব (‘আপনারা কি চুড়ি পরে থাকেন? ‘একটার বদলে দশটা লাশ চাই’) এবং দলীয়
পর্যায়ে চর্চিত সন্ত্রাসী কালচার (লাঠি-বৈঠা-লগি ব্যবহার, ২৮.১০.২০০৬)।
বুধবার ২৪ এপৃলে সহমাস্তানরা রানা প্লাজার বেইসমেন্টে আটক পড়লেও সোহেল রানা
বেরিয়ে যেতে পারে। সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সাভার তথা সারা দেশ জুড়ে স্লোগান
রানার ‘ফাঁসি চাই’। বস্তুত, স্লোগানের চার্ট যদি বাংলাদেশে হতো তাহলে শেখ
হাসিনা জানতেন ওই চার্টে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ এই দুটি স্লোগান
জনপ্রিয়তায় নিচে নেমে গিয়েছে। টপ প্লেস এখন দখল করেছে ‘ফাঁসি চাই’ স্লোগান।
এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে শাহবাগ চত্বরে তথাকথিত জাগরণের স্লোগান কন্যা
লাকি আকতার। সারা দেশ জুড়ে দাবি ওঠে রানাকে গ্রেফতারের। এই কাজটা আওয়ামী
সরকারের জন্য কঠিন ছিল না। সরকার সংশ্লিষ্টরা অনুমান করেছিলেন সোহেল রানা
নিশ্চয়ই আওয়ামী কোন নেতার আশ্রয় ও সহযোগিতায় তাদের প্রিয় গন্তব্যস্থল
ইনডিয়াতে চলে গিয়েছে অথবা চলে যাবার চেষ্টা করছে। রোববার ২৮ এপৃলে সোহেল
রানা ধরা পড়ে এবং তাদের অনুমান সত্যি প্রমাণিত হয়।
সেদিন বেলা তিনটার দিকে যশোরের বেনাপোল রেল স্টেশন বল ফিল্ড এলাকা থেকে
সোহেল রানাকে সঙ্গী মিঠুসহ আটক করা হয়। জনৈক অনিলকে সঙ্গে নিয়ে রোববার ভোরে
ফরিদপুরের কানাইপুর থেকে সে বেনাপোলে পৌঁছেছিল। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী
লীগকর্মী ফার্নিচার ব্যবসায়ী শাহ আলম মিঠু তাকে আশ্রয় দেয়। ইতিমধ্যে খবর
পেয়ে দুপুর দু’টার দিকে র্যাবের ইনটেলিজেন্স ডিরেক্টর লে. কর্ণেল জিয়া
আহসান-এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম হেলিকপটারে যশোর এয়ারপোর্টে পৌঁছে যায়।
তারা কঠোর গোপনীয়তায় বল ফিল্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে রানা ও মিঠুকে আটক করতে
পারে কিন্তু অনিল পালিয়ে যায়। বেলা সাড়ে তিনটায় রানা—মিঠুকে যশোর
এয়ারপোর্টে নেয়া হয়। সেখানে প্রেস কনফারেন্সে লে. কর্ণেল জিয়া আহসান জানান,
রোববার সন্ধ্যার পরে কোন এক সময়ে বর্ডার ক্রস করে রানা ইনডিয়াতে যাবার
প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইনডিয়াতে পার করে দেয়া শর্তে রানা অনিলের মাধ্যমে
মিঠুকে টাকা দিয়েছিল।
সত্যটা কে বলছেন?
প্রধানমন্ত্রী নাকি র্যাব ডিজি?
কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে রানাকে হেলিকপটারে নিয়ে আসা হয় ঢাকাতে। যে ব্যক্তি
পায়ে হেঁটে গোলাপ মার্কা সরিষার তেল বিক্রি করতো সেই ব্যক্তি প্র্যাডো
থেকে উন্নীত হয় হেলিকপটারে। তবে এই ফ্লাইট সুখকর হয়নি। যশোর এয়ারপোর্টেই
লে. কর্ণেল জিয়া আহসান জানান, আটক করার সময়ে রানার হাতে থাকা একটি ব্যাগ
থেকে প্রচুর টাকা ও কয়েক বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। হেলিকপটারে বসে
সোহেল রানা বুঝেছিল রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় তার শাস্তি হোক বা না হোক মানি
লন্ডারিং ও মাদক দ্রব্য মামলায় তার কিছু শাস্তি হবে। ওই মামলার শুনানিতে
যদি সে বলে, ফেনসিডিল কখনো ইনডিয়া মুখী হয় না—ইনডিয়ান ফেনসিডিল হয় বাংলাদেশ
মুখী, তাহলেও সে রেহাই পাবে না।
ইতিমধ্যে যশোর-খুলনায় গুজব রটে যায় রানা ঠিকই ইনডিয়াতে পালিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারকে রক্ষার জন্য ইনডিয়ানরা তাকে ফেরত্ পাঠিয়ে
দিয়েছে। এসব গুজব থেকে বোঝা যায় পুলিশের কথা যেমন মানুষ বিশ্বাস করে না,
ঠিক তেমনি র্যাবও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে চলেছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে
হলে র্যাব কর্মকর্তাদের নির্ভীক ও সত্যবাদি হতে হবে—মাননীয়’র স্তুতি ছাড়তে
হবে।
রোববার বিকেলে ঢাকায় র্যাব হেড কোয়ার্টার্সে প্রেস কনফারেন্সে র্যাব
ডিরেকটর জেনারেল মোখলেসুর রহমান জানান, রানা প্লাজায় ব্যাপক হতাহতের মূল
হোতা সাভার পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা। ...প্রাথমিক
জিজ্ঞাসাবাদে রানা স্বীকার করেছে সে গ্যার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খোলা রাখতে
মালিকদের চাপ দিয়েছিল। শ্রমিকদের জোর করে ভবনের ভেতরে ঢুকিয়েছিল। ঘটনার পর
ঘন্টা দুয়েক সে সাভারে ছিল। পরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জনৈক শামীমের বাড়িতে
আশ্রয় নেয়। প্রথম রাত সেখানে থাকে। দ্বিতীয় দিন মানিকগঞ্জে তার বন্ধু
আফজাল শরিফের বাসায় ওঠে। সেখানে এক রাত থেকে চলে যায় ফরিদপুরে। ইনডিয়া
যাওয়ার প্ল্যান করে ফরিদপুরে।
তাহলে কে সত্যি বলছেন? র্যাবে ডিজি? নাকি প্রধানমন্ত্রী? পাঠক এবং টিভি
দর্শকদের হয়তো মনে পড়বে দুর্ঘটনার প্রথম দিনে শেখ হাসিনা সংসদে বলেছিলেন,
“রানা প্লাজার মালিক স্থানীয় যুবলীগ নেতা বলে গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।
আমি সাভারের যুবলীগের কমিটির নাম নিয়ে এসেছি। সেখানে রানার নাম নেই।”
(প্রথম আলো ২৫.৪.২০১৩)।
এখন সাহস পেয়েছেন আওয়ামী নেতারা
রানা গ্রেফতার হবার সংবাদ পাওয়ার পর সাভার এলাকার আওয়ামী নেতারা মুখ খুলতে সাহসী হন। দৈনিক কালের কণ্ঠ-র রিপোর্টের কিছু অংশ পড়ুন।
ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাভারের সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন খান
ইমু বলেন, “সাভারে সোহেল রানার অপকর্মের প্রতিবাদ করার কেউ নেই। জমি দখল,
মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা, হত্যাকাণ্ড সব অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর
এমপি মুরাদ জং হলেন তার শেলটারদাতা। এমপির কারণেই তো আজ এই অবস্থা।” ঢাকা
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাভারের বাসিন্দা হাসানউদ্দৌলা বলেন, “রানার
সাথে এমপির ঘনিষ্ঠতার কথা ঘুরে ফিরে আসছে। আমার সাথে রানার ঘনিষ্ঠতার কথা
তো কেউ বলছে না। তাহলে সমস্যা তো আছেই।” সাভার পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ
সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, এখন এমপি তো বলেন সম্পর্ক নেই। পত্রিকায় ছবি
এসেছে। এখন তো অস্বীকার করার কিছু নেই। রানা এক সময়ে ছাত্রলীগ করতেন,
সেটাতো এমপিও অস্বীকার করতে পারবেন না। আর এই যুবলীগের পদ দিয়েছেন যুবলীগের
সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিন ও এমপি মুরাদ জং।” আওয়ামী লীগ নেতা ও
সাভার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফিরোজ কবির বলেন, “সাভারে
রাস্তাঘাটে হাঁটেন। দেখেন সবাই বলবে এমপির সাথে যাদেরই ঘনিষ্ঠতা আছে, সেটার
মূল কারণ হলো আর্থিক লেনদেন। সেখানে কোন দল নেই। জায়গা দখল, ঝুট ব্যবসা,
পরিবহন চাঁদাবাজিসহ কিছু লোকজন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন এমপি। রানা হলেন তাদের
একজন।” (কালের কণ্ঠ ২৯.৪.২০১৩)।
এরপরে টিভি ইন্টারভিউতেও মোহাম্মদ ফিরোজ কবির বলেন, সোহেল রানা ছিল যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক।
স্থানীয় আওয়ামী নেতারা যে সোহেল রানা গ্রেফতারে মুখ খুলেছেন তাতে স্পষ্ট
হয়ে ওঠে মুরাদ জং সোহেল রানা জুটি সাভারে কতো গভীর সন্ত্রাসের শাসন কায়েম
করেছিল।
ধরা পড়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
কিন্তু শেখ হাসিনা এসব কিছুই জানতেন না অথবা জানলেও সংসদে সরাসরি অস্বীকার
করেছেন। অথচ তিনি জানেন বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল থেকে শুরু করে বিএনপির
শতশত নেতাকর্মীরা কবে কোথায় কি করেছেন এবং সেসব অভিযোগে তাদের জেলে
পুরেছেন। আরো হাস্যকর কথা হচ্ছে, এদের সবাইকে জেলে পুরে বিরোধী নেত্রী
খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন। সবাই বোঝেন শেখ হাসিনা বাধ্য
হবেন বিএনপি নেতাদের ছেড়ে দিতে। কারণ মানুষের কাছে তিনি ধরা পড়ে গিয়েছেন
মিথ্যাবাদী রূপে। তার মিথ্যা কথনকে ধরিয়ে দিয়েছেন সাভারে তারই দলের নেতারা।
4.
আমেরিকার
৩৭তম প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৬৮-তে।
তার চার বছরের মেয়াদ ১৯৭২-এ ফুরিয়ে যাবার আগে তিনি সেই বছরে আবার
প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবার তিনি প্রথমবারের চাইতে অনেক
বেশি ভোটে নির্বাচিত হন। জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ছিল এবং প্রত্যাশিত ছিল যে, আরো
চার বছর প্রেসিডেন্ট পদে থেকে তিনি ১৯৭৬-এ বিদায় নেবেন। কিন্তু একটি মিথ্যা
কথা বলার জন্য নিক্সনকে বিদায় নিতে হয় দুই বছর আগেই ১৯৭৪-এ।
নিক্সন কি মিথ্যা বলেছিলেন?
নিক্সনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল যে, বিরোধী রাজনৈতিক দল ডেমক্রেট পার্টির
নেতাদের এবং অন্যান্য বিরোধী মতাবলম্বীদের ঘায়েল করার জন্য তার প্রশাসন
অবৈধ পন্থা অবলম্বন করেছে। বলা হয়েছিল প্রতিপক্ষদের হয়রানি করার জন্য
নিক্সন তার গোয়েন্দা বাহিনী এফবিআই, সিআইএ এবং ট্যাক্স আদায় বিভাগ
(ইনটারনাল রেভিনিউ সার্ভিস)-কে কাজে লাগিয়েছিলেন। নিক্সন এই অভিযোগ
অস্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেন, এই ধরনের তত্পরতা বিষয়ে কিছুই জানেন না। তখন
তাকে বলা হয়, একটি টেপে প্রমাণ পাওয়া গেছে, নিক্সন এসব জানতেন এবং তিনিই
এসব হয়রানির আদেশ দিয়েছিলেন। এই পর্যায়ে নিক্সন বলেন, ওই টেপে তার ওই ধরনের
কোনো বক্তব্য নেই। আদালত তখন তাকে আদেশ দেয় ওই টেপ আদালতে জমা দিতে।
নিক্সন বাধ্য হন ২০ জুন ১৯৭২-এ টেপ জমা দিতে। তখন দেখা যায় ওই টেপের সাড়ে
আঠারো মিনিট মুছে ফেলা হয়েছে। ধারণা করা হয় সেখানেই নিক্সনের হয়রানিমূলক
আদেশটি ছিল। প্রেসিডেন্টের পার্সনাল সেক্রেটারি মিজ রোজ মেরি উডস
প্রেসিডেন্টকে বাচানোর জন্য বলেন, তিনিই (রোজ মেরি উডস) ভুলক্রমে ওই অংশটি
মুছে ফেলেছেন। যদিও নিক্সন নিজেই টেপের এই অংশটি মুছে ফেলেছেন—সেটা
প্রমাণিত হয়নি এবং যদিও ওই অংশে তিনি কি বলেছিলেন সেটা জানা যায়নি—তবুও
আদালত, আমেরিকান সিনেট ও কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য এবং আমেরিকান মিডিয়া ও
জনগণ এই সিদ্ধান্তে আসে যে, প্রেসিডেন্ট নিক্সন জানতেন তার প্রতিপক্ষকে
হয়রানি করা হচ্ছে। অর্থাত্, দেশবাসীকে মিথ্যা বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট।
এর ফলে তাকে ইমপিচ করার সম্ভাবনা দেখা দেয় এবং তার ফলে ৯ আগস্ট ১৯৭৪-এ
প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করেন। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার পদে থেকেও
সরকার প্রধানকে যে মিথ্যা কথার জন্য পদত্যাগ করতে হয়, ওয়াটারগেইট কেলেংকারি
রূপে কুখ্যাত এই ঘটনাটি তার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মাত্র একটি মিথ্যা কথনের জন্য, তাও নিজের টেপ মাত্র সাড়ে আঠারো মিনিট মুছে
ফেলার বিষয়ে মিথ্যা কথনের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে পদত্যাগ করতে
হয়েছিল।
এই ঘটনার বিপরীতে বিবেচনা করুন গত প্রায় সাড়ে চার বছরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতো প্রসঙ্গে কতোবার মিথ্যা বলেছেন।
পিলখানা থেকে রানা প্লাজা
সামরিক ও বেসামরিক জীবন বিপন্ন
সর্ব প্রথমে বিবেচনা করুন তার ক্ষমতাসীন হবার ৪১ দিন পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি
২০০৯-এ ঢাকায় পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ সেনা অফিসারসহ ৭৩ জন নিহতের
ঘটনাটি। ওই ঘটনায় নিহত বিডিআর চিফ জেনারেল শাকিলের ছেলে রাকিন আহমেদ লন্ডন
থেকে দাবি করেন, ঘটনার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আগেই জানতেন এবং সে জন্যে তিনি
ওই দিনে পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পিলখানায় যান নি। রাকিন আহমেদের
এই দাবির আগেই এমন অভিযোগ চলমান ছিল। রাকিন এই অভিযোগে আরো বিশ্বাসযোগ্যতা
দেন এবং প্রধানমন্ত্রী যে সত্য গোপন করেছেন—সেই ধারণা জনমনে বদ্ধমূল হয়।
আর সবশেষে বিবেচনা করুন ২৪ এপৃল ২০১৩-তে সাভারে ভবন ধসে বহু শত মানুষের
হতাহত, নিখোজ হওয়া এবং তার সঙ্গে ভবন মালিক যুব লীগ নেতা সোহেল রানার
সংশ্লিষ্টতা। ওই দিন দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বলেন, সোহেল রানা যুব লীগের কেউ নন। এই প্রসঙ্গে ২ মে ২০১৩-তে সিএনএন থেকে
প্রচারিত একটি ইন্টারভিউতে প্রখ্যাত সংবাদিক মিজ কৃশ্চিয়ান আমানপোরের
প্রশ্নের উত্তরে (অতি দুর্বল গোপালিশ ভাষায়, লিসেন! লিসেন!) শেখ হাসিনা এই
মিথ্যাচার আবারো করেন। পরপর তিনবার শেখ হাসিনা বলেন, সোহেল রানা যুব লীগের
সদস্য নন। এই ইন্টারভিউতে তিনি আরো কিছু অসত্য এবং অর্ধসত্য বলেন।
এই দুটি ঘটনার মধ্যে বিবেচনা করুন গত প্রায় সাড়ে চার বছরে শেখ হাসিনা আরো
যেসব মিথ্যা বলেছেন। যেমন, দশ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানো, বিনামূল্যে সার
দেওয়া এবং ঘরে ঘরে চাকরি সৃষ্টি করা, প্রভৃতি নির্বাচনীয় প্রতিশ্রুতি
প্রসঙ্গে।
রিচার্ড নিক্সনের তুলনায় শেখ হাসিনার মিথ্যাচারের কুফল ও পাপ অনেক বেশি।
রিচার্ড নিক্সনের পাপে তার দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ হয়েছিল বিপজ্জনক। আর শেখ
হাসিনার পাপে বাংলাদেশে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ধরনের জীবনই হয়েছে বিপন্ন।
গুডবাই গার্মেন্টস মার্কেট
শুধু তাই নয়। শেখ হাসিনার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বিবৃতির ফলে বাংলাদেশের
অর্থনৈতিক জীবন হয়েছে বিপদগ্রস্ত। সিএনএনে কৃশ্চিয়ান আমানপোরের
ইন্টারভিউয়ের ফলে গার্মেন্টসের আন্তর্জাতিক বাজার হারাতে বসেছে বাংলাদেশ।
এই ইন্টারভিউতেই আমানপোর জানিয়েছেন বিশ্বে সবচেয়ে বড় গার্মেন্টস ক্রেতা
আমেরিকান কম্পানি ডিসনি বলেছে, বাংলাদেশ থেকে তারা আর গার্মেন্টস কিনবে না।
বাংলাদেশের ২৩% গার্মেন্টস কেনে আমেরিকা। কানাডা যারা বাংলাদেশের ৫%
গার্মেন্টস কেনে, তারাও চিন্তা করছে যেসব সুযোগ-সুবিধা তারা বাংলাদেশকে
দিতো, সেসব প্রত্যাহার করে নেওয়া। আর ইওরোপিয়ান ইউনিয়ন যারা বাংলাদেশের ৬০%
গার্মেন্টস কেনে, তারা জরিমানা আরোপের বিষয় চিন্তা করছে।
রিচার্ড নিক্সনকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। শেখ হাসিনাকেও ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হবে।
প্রয়োজন ছিল বিদেশি পরামর্শক
রানা প্লাজা ধসে পড়ার পরে শুধু মিথ্যাচারই নয়—আওয়ামী সরকার বহু দুরাচারও
করেছে এবং সে জন্য প্রধানত দায়ী প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা
আলমগীর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মনি, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ও দুর্যোগ
ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।
এদের সম্মিলিত প্রথম দুরাচার হলো এরা উদ্ধার কাজে বৈদেশিক সাহায্য চান নি।
বরং বিদেশিরা সেই সাহায্য অফার করলে বাংলাদেশের মর্যাদা হানি হবে—এই
যুক্তিতে তারা সেসব অফার নাকচ করে দিয়েছিলেন। এখন জানা যাচ্ছে, দুর্ঘটনার
পরপরই জাতিসংঘ, আমেরিকা ও বৃটেন টেকনিকাল পরামর্শক পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু
বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটা রিফিউস করে দেয়।
বিদেশে ভবন নির্মাণ বিষয়ে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং কনসালটিং ফার্ম আছে ঠিক তেমনি
প্রয়োজনে কোনো ভবন অপসারণের জন্য ডিমলিশিং (Demolishing) এক্সপার্টস ফার্ম
আছে। এই ডিমলিশিং বিশেষজ্ঞরা জানেন, কিভাবে ভবন ভাংতে হয় এবং কিভাবে ভাঙ্গা
ভবনে উদ্ধার কাজ করতে হয়। বিভিন্ন ধরনের সেন্সর (Sensor) ইন্সট্রুমেন্টস
এবং অক্সিজেন সাপ্লাই, নিউম্যাটিক ডৃলিং মেশিন, কাটিং, লাইটস, সরঞ্জাম
তাদের থাকে। তারা জানে কোনখান থেকে কাজ শুরু করতে হয়। রানা প্লাজা
দুর্ঘটনার পরপরই আমেরিকান ও ইওরোপিয়ান সাহায্যে ডিমলিশিং ও রেসকিউ
এক্সপার্টদের বাংলাদেশে নিয়ে এলে এতোদিনে সব নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত অথবা
মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা যেত। এতোদিনে আটকে পড়া ব্যক্তিরা গলে পচে ধংসস্তূপে
মিশে গিয়েছেন।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি খনি দুর্ঘটনা হয় চায়নাতে। তারা জানে মাটির নিচ থেকে
কিভাবে মানুষ উদ্ধার করতে হয়। পশ্চিমের সাহায্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ
সরকারের উচিত ছিল চায়নারও সাহায্য চাওয়া।
উচিত ছিল বিদেশি মিডিয়াকে আসতে দেয়া
আওয়ামী সরকারের দ্বিতীয় দুরাচারটি হচ্ছে তারা বিশ্ব মিডিয়ার কাছে সাভার
দুর্ঘটনার ভয়াবহতা গোপন করে যেতে চেয়েছে। এজন্য তারা সিএনএনসহ আরো কিছু
বিশ্ব টিভি ও নিউজ পেপারকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেয়নি। সিএনএন উপস্থাপিকা
আমানপোর যখন বিষয়টির প্রতি শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তখন তিনি
প্রথমে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
নিচে এই ইন্টারভিউয়ের একটি অংশ পড়ুন :
আমানপোর : প্রধানমন্ত্রী, স্বচ্ছতার ব্যাপক অভাব দেখা যাচ্ছে। আমি এটা
বলছি, কারণ সিএনএনকে এ নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করতে বাংলাদেশে আসার সুযোগ দেয়া
হয়নি। স্পষ্টভাবেই বলছি, আপনি যেসব কথা বলছেন, সেগুলো ভালো হতো, যদি আমাদের
তা দেখার সুযোগ দেয়া হতো। অন্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোকেও দেয়া
হয়নি। আপনার সরকার...
শেখ হাসিনা : আমি দুঃখিত। সিএনএনকে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দেয়া হয়নি?
আমানপোর : না। না আসতে দেয়া হয়নি। আমি এখন আপনাকে বলছি, (আপনাদের) এই সিদ্ধান্ত বদলাতে।
শেখ হাসিনা : আপনি কি নিয়ে বলছেন?
আমানপোর : আমি তা বলেছি। সিএনএনকে এই বিষয় নিয়ে লেখার সুযোগ দেয়া হয়নি।...
শেখ হাসিনা : (এটা ঠিক) না। আমি দুঃখিত।
আমানপোর : না, ম্যাম...
শেখ হাসিনা : আপনি কি বললেন?
আমানপোর : আমি বলেছি, এই রিপোর্ট লিখতে সিএনএন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক
সংস্থাকে সাংবাদিক হিসেবে আসার অনুমতি দেয়া হয়নি। তাদের ওপর খুব কড়াকড়ি
আরোপ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা : না। এটা সত্য নয়।
আমানপোর : এটা সত্য।
শেখ হাসিনা : না, না, না।
আমানপোর : হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা সত্য।
শেখ হাসিনা : না, না। বাংলাদেশ মুক্ত দেশ।
আমানপোর : আহ! আমাদের সেসব আগে শোনানো হয়েছে।
শেখ হাসিনা : না, শুনুন, আমাদের দেশে, আমাদের প্রাইভেট টেলিভিশন আছে। না,
আমাকে একটা কথা বলুন। যদি বাধা দেয়া হয়েই থাকে তবে কেন আমি এখন আপনার সঙ্গে
কথা বলছি?
আমানপোর : কারণ আমি সেখানে (ঢাকায়) নেই।
শেখ হসিনা : আমরা যদি সিএনএনকে বাধা দিয়ে থাকি, তবে আমি কেন কথা বলছি?
আপনাকে থামানো হতো। আপনি এটা প্রকাশ করতে পারতেন না। আপনি যদি বুঝে থাকেন,
আমরা সিএনএনকে বাংলাদেশে আসতে বাধা দিয়েছি, তাহলে আমার এই ইন্টারভিউ প্রকাশ
করা আপনার উচিত হবে না।
আমানপোর : তাহলে ঠিক আছে। আমাদের সিএনএন কর্তৃপক্ষ এবং আমাদের সাংবাদিকদের
কি বলা হয়েছিল, তা বলছি। তাদের বলা হয়েছিল, এমন একটি কাগজে তাদের সই করতে
বলা হয়েছিল যার ফলে সরকার চাইলে রিপোর্ট বদলাতে হতো। আমি পড়ছি, তাদের কি
বলা হয়েছিল। এসব কর্মকর্তা বলছিলেন তাদের রিপোর্ট পর্যালোচনা, বাজেয়াফত
করার অধিকার থাকবে...।
শেখ হাসিনা : শুনুন... আমি বিষয়টি জানি না। তবে হ্যাঁ, কিছু বিধিবিধান
রয়েছে। সব দেশেই এ ধরনের বিধিবিধান রয়েছে। প্রত্যেককেই তা পালন করতে হয়।
ইয়াহিয়া সরকার ও হাসিনা সরকার
সিএনএনসহ ওয়ার্ল্ড মিডিয়া যদি বাংলাদেশে ইমিডিয়েটলি এসে পৌঁছাতো তাহলে
তাদের প্রচারের ফলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশে
ত্রাণকর্মী পাঠাতে পারতো। তারা আধুনিকতম পদ্ধতিতে সাভার রেসকিউ অপারেশন
করতে পারতো।
এমনটা ঘটেছিল ১২ নভেম্বর ১৯৭০-এ, বাংলাদেশের দক্ষিণে মনপুরায় জলোচ্ছ্বাসের
পরে। তখন ঢাকায় একটি মাত্র ফাইভ স্টার হোটেল (ইন্টারকন্টিনেন্টাল, যেটি এখন
রূপসী বাংলা) ছিল। এই হোটেলের তিনশ রুম ভর্তি হয়ে যাবার পর লবি, লাউঞ্জ ও
বলরুমে ক্যাম্প বেড ও মেঝেতে বিদেশ থেকে আসা ত্রাণকর্মীরা ছিলেন। সেই সময়ে
পাকিস্তানের ইয়াহিয়া সরকার তাদের আসতে দিয়েছিল।
এবার ২০১৩-তে সাভারে বিশ্ব গার্মেন্টস ইনডাস্টৃর বৃহত্তম দুর্ঘটনা ঘটে
গেলেও একজনও বিদেশি ত্রাণকর্মী আসেন নি। খুব কমই বিদেশি মিডিয়া পার্সনালিটি
বাংলাদেশে আসতে পেরেছেন। এজন্য নিশ্চয়ই কৃতিত্ব দাবি করতে পারে প্রথম
মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত কিন্তু তথাকথিত “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে”র উদগাতা
স্বাধীন বাংলাদেশের হাসিনা সরকার।
ঢাকার ডিপ্লম্যাটিক সার্কল হতভম্ব হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের অহমিকা এবং অবিমৃশ্যকারিতা দেখে।
“রিয়ালি সিরিয়াস নয়”
সিএনএনে আমানপোর-হাসিনা ইন্টারভিউয়ের পরপরই ৩ মে ২০১৩-তে দিল্লিতে
অর্থমন্ত্রী মুহিত একটি প্রেস কনফারেন্সে বলেন, “বর্তমানে যে সমস্যা হয়েছে,
সেটা রিয়ালি সিরিয়াস বলে আমি মনে করি না। এটা একটা অ্যাকসিডেন্ট। এমন ঘটনা
যেন আর না ঘটে সেটা নিশ্চিত করার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। সেসব
ব্যবস্থা বেশ ব্যাপক। আমি মনে করি তাতে সবাই আশ্বস্ত হবেন।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশি ক্রেতারা চলে যাবে এমন সম্ভাবনা নাকচ করে মুহিত বলেন,
এ ধরনের দুর্ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা... অ্যাকসিডেন্ট। সেটা সবখানেই
ঘটে।”
(The present difficulties... well, I don’t think it is really
seriousÑit’s an accident. And the steps we have taken in order to make
sure that is doesn’t happen, they are quite elaborate and I believe will
be appreciated by all... these are individual cases of... accidents. It
happens everywhere) (দি গার্ডিয়ান, লন্ডন ৩.৫.২০১৩)
রিয়ালি?
অ্যাকসিডেন্ট কি সবখানেই ঘটে?
অর্থমন্ত্রী সচিবালয়ের যে ভবনটির চতুর্থ তলায় বসেন কাকতালীয়ভাবে সেটি রানা
প্লাজার মতো নয় তলা ভবন। সেখানে কি রানা প্লাজার মতো অ্যাকসিডেন্ট কখনও
হবে? প্লিজ, চেক ইট, মিস্টার ফাইনান্স মিনিষ্টার।
বাংলাদেশ অ্যাকসিডেন্ট হয় গরিব মানুষের বস্তিতে, গরিব মানুষের যানবাহনে এবং গরিব মানুষের ফ্যাক্টরিতে।
অর্থমন্ত্রীর প্রিয় তিনটি শব্দ হচ্ছে ননসেন্স, স্টুপিড ও রাবিশ।
দিল্লিতে তার মন্তব্যকে সবাই বলছেন, “ননসেন্স”।
সাভারে নয় তলা রানা প্লাজা হয়েছে জীবন্ত মানুষের কবর সংবলিত স্তূপীকৃত “রাবিশ”।
আর এ সবই প্রমাণ করেছে আসলে কে “স্টুপিড”।
“অ্যাকসিডেন্ট”
অর্থমন্ত্রী মুহিত প্রতিধ্বনি করেছেন তার বসের। মুহিতের মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে একই কথা বস শেখ হাসিনা বলেছিলেন আমানপোরকে।
ওই ইন্টারভিউতে হাসিনা বলেন, বিশ্বের যে কোনো স্থানে যে কোনো অ্যাকসিডেন্ট
ঘটতে পারে। আপনি কোনো কিছুর ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন না। এমনকি আমরা দেখছি,
উন্নত দেশগুলোও পারে না। আপনি জানেন, সম্প্রতি টেক্সাসে একটি সার কারখানায়
অ্যাকসিডেন্ট ঘটেছে। তার মানে, অ্যাকসিডেন্ট ঘটতেই পারে। (But you know,
in anywhere in the world, any accident can take place. You cannot, you
know, predict anything, even in many developed country, we can see.
Recently there was, you know, an accident in a fertilizer industry in
Texas. So accidents may take place.) (সিএনএন ২.৫.২০১৩)
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর যুক্তি (অ্যাকসিডেন্ট হতেই পারে) কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ধরুন, আপনি যদি আপনার পরিবারকে নিয়ে একটি মোটরকারে ড্রাইভে যান তাহলে কোনো
দুর্ঘটনা ঘটলে সেটাকে বলতে পারেন, “অ্যাকসিডেন্ট”। কিন্তু মোটরকারের
বিভিন্ন পার্টস যদি আগেই ত্রুটিপূর্ণ থাকে এবং তার ফলে যদি কোনো দুর্ঘটনা
ঘটে, তাহলে সেটাকে অ্যাকসিডেন্ট বলা যাবে না। এই ধরনের পরিহারসাধ্য
দুর্ঘটনাকে বলা যেতে পারে অ্যাভয়ডেবল অ্যাকসিডেন্ট।
রানা প্লাজার অ্যাকসিডেন্টটি সেই রকমই ছিল।
ভবনটিতে আগে থেকেই ফাটল দেখা গিয়েছিল।
রানা প্লাজা ধ্বংস হওয়া এড়ানো যেত না — কিন্তু মানুষ হতাহত হওয়াটা এড়ানো যেত।
আমি ২৪ এপৃল ২০১৩-র রাতে সাভারে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মিরপুর ছাড়িয়ে
যাবার কিছু পরে পুলিশ আমার গাড়িকে ফিরিয়ে দেয়। এরপর ৪ মে ২০১৩-র সকালে আমি
সাভারে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি রানা প্লাজায় বিদ্যুত্
সরবরাহ অনিয়মিত ছিল। তাই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কয়েকটি ফ্লোরে (তিন, চার,
পাঁচ, ছয় ও সাত) জেনারেটর ছিল। এর মধ্যে ফোর্থ ফ্লোরের জেনারেটর ছিল সবচেয়ে
ভারি। এসব জেনারেটর যখন চলতো তখন ভবনটি কাঁপতো। ঘটনার দিন সকাল নয়টার দিকে
জেনারেটর চালু করার সঙ্গে সঙ্গে দেড় মিনিটের মধ্যে নয় তলা ভবনটি ধসে পড়ে।
রানা প্লাজায় একাধিক জেনারেটর ও ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখার পরে
শ্রমিকদের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ ঘটনার দিন কেন
শ্রমিকদের ভেতরে ঢুকতে দিল সেই প্রশ্ন স্থানীয় মানুষরা করছেন। বিরোধী
রাজনৈতিক দল দমনে গোপালীদের যে তত্পরতা দেখা যায় রানা প্লাজায় দুর্ঘটনা
এড়াতে সেই তত্পরতা দেখা গেল না কেন?
আওয়ামী সরকার কেন ভীত?
একটা প্রশ্ন এখন অনেকেই করছেন।
কেন আওয়ামী সরকার বিদেশি উদ্ধার সাহায্য এবং বিদেশি মিডিয়া বিষয়ে এত ভীত?
এর উত্তর হচ্ছে, বাংলাদেশে ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থাকার লক্ষ্যে তারা বিদেশে প্রচার করে চলেছে।
এক. ইসলামি জাগরণ ও ইসলামি সন্ত্রাস ঠেকাতে একমাত্র তারাই সক্ষম।
দুই. গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখতে একমাত্র তারাই সক্ষম।
তিন. দেশে শান্তি বজায় রাখতে একমাত্র তারাই সক্ষম।
চার. শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে একমাত্র তারাই সক্ষম।
আওয়ামী সরকার জানে, বিদেশি মিডিয়া এখানে এলে তাদের এসব মিথ্যা প্রচার ধরে
ফেলবে। বিদেশি মিডিয়া জানবে, এক. হেফাজতে ইসলামি তথা ইসলামি জাগরণের জন্য
দায়ী আওয়ামী সরকার পৃষ্ঠপোষিত শাহবাগী জাগরণ। দুই. বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই।
এখন বাংলাদেশে চলছে হাসিনা সংবিধান যা সুপারভাইজ করছে আওয়ামী দলীয়
বিচারবিভাগ। তিন. বাংলাদেশে শান্তি নেই। সুখ সুদূরপরাহত। বাংলাদেশে আছে,
সেনা হত্যা, বিডিআর নির্যাতন, শেয়ারবাজার লুট, ডেসটিনি প্রতারণা, হলমার্ক
ব্যাংক লুট, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধি, রিমান্ডে টর্চার, আজ্ঞাবহ
বিচার বিভাগ, ইনডিয়াকে অবাধে ট্রানজিট দান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি
এবং গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন ও ধস। চার. বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের
স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় উত্সাহী শুধু কয়েকজন তরুণ-তরুণী যাদের
কাজ করে খেতে হয় না।
অমানুষ মানুষের জন্য
আওয়ামী সরকারের প্রায় সাড়ে চার বছর ব্যাপী এসব কুকাণ্ডের জন্য দায়ী
প্রধানমন্ত্রী, বিশেষ কয়েকজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং কিছু নেতা। এরা কখনো
টাইটেল পেয়েছেন হাই কোর্ট থেকে “রং হেডেড”। কখনো টাইটেল পেয়েছেন “উন্মাদ”
(স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই টাইটেল দিয়েছেন এরশাদ)। কখনো নিজেরাই নিজেকে
টাইটেল দিয়েছেন “ঘৃণিত”।
কিন্তু একটা সমাজে যে কোনো সময়ে কিছু রং হেডেড, কিছু উন্মাদ, কিছু ঘৃণিত
ব্যক্তি থাকতেই পারে। তাদের নিয়েই সমাজকে চলতে হয়—কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও।
কিন্তু মানুষ যখন দানব হয়ে যায় তখন কোনো দেশ ও সমাজ চলতে পারে না। নিজের
প্রাণ বাঁচানোর জন্য সাধারণ মানুষ ব্যাকুল হয়ে চায় গণহত্যাকারী অমানুষরা
যেন বিদায় নেয়।
প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ স্লোগান দিয়েছিলেন “তুই রাজাকার”। সাংবাদিক ও টকশো কথাকার এবিএম মূসা স্লোগান দিয়েছিলেন “তুই চোর”।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তের স্লোগান হওয়া উচিত, “তুই দানব, তুই যা।” (চলবে)