শুক্রবার, ২৮ জুলাই, ২০১৭

বাসন্তী- সব কবিতার খাতা


বাসন্তী

---কাজী নজরুল ইসলাম।

.
কুহেলীর দোলায় চ'ড়ে
এলো ঐ কে এলো রে?
মকরের কেতন ওড়ে
শিমুলের হিঙুলে বনে।
পলাশের গেলাস - দোলা
কাননের রংমহলা,
ডালিমের ডাল উতলা
লালিমার আলিঙ্গনে।।
.
না যেতে শীত - কুহেলী
ফাগুনের ফুল - সেহেলি
এলো কি? রক্ত - চেলী
করেছে বন উজালা।
ভুলালি মন ভুলালি
ওলো ও শ্যাম - দুলালী
তমালে ঢাললি লালী
নীলিমার লাল দেয়ালা।।
.
ওলো এ ব্যস্ত - বাগীশ
মাধবের নকল - নবীশ
মধুরাত নাই হ'তে-- ইস্
মাধবীর কুঞ্জে হাজির !
বলি ও মদন - মোহন !
না যেতে শীতের কাঁপন
এলে যে, থালায় এখন
ভরিনি কুমকুম আবীর।।
.
হা - রা - রা হোরীর গীতে
মাতি নি আজও শীতে
অধরের পিচকিরিতে
পুরিনি গানের হিঙুল।
গাহে নি কোয়েল সখি--
'মর লো গরল ভখি !'
এখনি শ্যাম এলো কি
আসেনি অশোক শিমুল।।
.
ওলো দ্যাখ্ শ্যামের পিছে
এসেছে কে এসেছে
দুলে কার চেলীর লালী !
তখনি বলেছি ভাই
আমাদের এ মান বৃথাই,
এলে শ্যাম আসবেনই রাই--
শ্রীমতী শ্যাম্ দুলালী।।
.
পউষের রিক্ত শাখায়
বঁধূ যেই বংশী বাজায়
নীল বন লাল হয়ে যায়
ফুলে হয় ফুলেল আকাশ।
এলে শ্যাম বংশী - ধারী
গোপনের গোপ - ঝিয়ারী
ফুল সব শ্যাম - পিয়ারী
ভুলে যায় ছার গেহ - বাস।।
.
সাতাসে - মাঘ - বাতাসে
যদি ভাই ফাগুন আসে
আঙনে রঙন হাসে
আমাদের সেই তো হোরি !
শ্রীমতীর লাল কপোলে
দোলে লো পলাশ দোলে
পায়ে তার পদ্ম ড'লে
দে লো বন আলা করি।।    
  
   

তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত



তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত।

মোরা    ভুলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ, তোমারি দেখানো পথ ॥

    বিলাস-বিভব দলিয়াছ পায় ধূলি সম তুমি, প্রভু,
    তুমি চাহ নাই আমরা হইব বাদশা-নবাব কভু।
    এই ধরণীর ধন-সম্ভার - সকলেরি তাহে সম অধিকার;
    তুমি বলেছিলে ধরণীতে সবে সমান পুত্র-বৎ ॥
প্রভু    তোমার ধর্মে অবিশ্বাসীরে তুমি ঘৃণা নাহি ক’রে
    আপনি তাদের করিয়াছ সেবা ঠাঁই দিয়ে নিজ ঘরে।
    ভিন্ ধর্মীর পূজা-মন্দির, ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর,
প্রভু    আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারিনে’ক পর-মত ॥
    তুমি চাহ নাই ধর্মের নামে গ্লানিকর হানাহানি,
    তলোয়ার তুমি দাও নাই হাতে, দিয়াছ অমর বাণী।
    মোরা ভুলে গিয়ে তব উদারতা
    সার করিয়াছি ধর্মন্ধতা,
    বেহেশ্‌ত্‌ হ’তে ঝরে নাকো আর তাই তব রহমত ॥





                                                    "দৃষ্টি তে আর হয় না সৃষ্টি আগের মত
গোলাপ ফুল,
কথায় সুরে ফুল ফোটাতাম- হয় না এখন আর
সে ফুল । বাসি হাসির মালা নিয়ে,
কি হবে নওরোজে গিয়ে?
চাঁদ না দেখে আঁধার রাতে-
বাঁধে কি গো এলোচুল! আজ দখিন হাওয়া ফাগুন আনে, বুলবুলি নাই
গুলিস্তানে,
দোলে না আর চাঁদ কে দেখে-
বনে দোলনচাঁপার ফুল । কি হারালো নাই কি যেন, মন হয়েছে এমন
কেনো?
কোন নিদয়ের পরশ লেগে- হয় না হৃদয় আর
ব্যকুল! দৃষ্টিতে আর হয় না সৃষ্টি আগের
মতো গোলাপ ফুল,
কথায় সুরে ফুল ফোটাতাম হয় না এখন আর
সে ফুল ।"  









শাতিল্ আরব! শাতিল্ আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহীদের লোহু, দিলীরের খুন ঢেলেছে যেখানে আরব-বীর!
          যুঝেছে এখানে তুর্ক-সেনানী,
          য়ুনানী, মেসরী, আরবী, কেনানী ; —
লুটেছে এখানে মুক্ত আজাদ্ বেদূঈনদের চাঙ্গা শির!
                                                 নাঙ্গা-শির্—
শমশের হাতে আঁশু-আঁখে হেথা মূর্ত্তি দেখেছি বীর-নারীর!
শাতিল্ আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

          “কূত্-আমারা”র রক্তে ভরিয়া
          দজ্লা এনেছে লোহুর দরিয়া ;
উগরি’ সে খুন তোমাতে দজ্লা নাচে ভৈরব মাস্তানী’র
                                                 ত্রস্তা-নীর
গর্জ্জে রক্ত-গঙ্গা ফোরাত, — “ শাস্তি দিয়েছি গোস্তাখীর!”
দজ্লা-ফোরাত-বাহিনী শাতিল্! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!

          বহায়ে তোমার লোহিত বন্যা
          ইরাক্ আজমে ক’রেছ ধন্যা,
বীর-প্রসূ দেশ হ’ল বরেণ্যা মরিয়া মরণ মর্দ্দমীর!
                                                 মর্দ্দ বীর
সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু পরে না শিকল পদ্ধতির!
শাতিল্ আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর।

          দুশমন-লোহু ঈর্শায়-নীল
          তব তরঙ্গে করে ঝিল্-মিল্,
বাঁকে বাঁকে রোষে মোচোড় খেয়েছে পিয়ে নীল খুন পিণ্ডারীর!
                                                 জিন্দা বীর
“জুলফিকার” আর “হায়দরী” হাঁক হেথা আজো হজরত আলীর—
শাতিল্ আরব! শাতিল আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।

          ললাটে তোমার ভাস্কর টীকা
          বসরা-গুলের বহ্নিতে লিখা ;
এ যে বসোরার খুন-খারাবী গো রক্ত-গোলাপ-মঞ্জরীর!
                                                খঞ্জরীর
খঞ্জরে ঝরে খর্জ্জুর সম হেথা লাখো দেশ-ভক্ত শির!
শাতিল্ আরব! শাতিল আরব!! পূত যুগে যুগে তোমার তীর!

          ইরাক্-বাহিনী! এ যে গো কাহিনী,—
          কে জানিত কবে বঙ্গ-বাহিনী
তোমারও দুঃখে “জননী আমার!” বলিয়া ফেলিবে তপ্ত নীর!
                                                রক্ত-ক্ষীর—
পরাধীনা! একই ব্যথায় ব্যথিত ঢালিল দু’ফোঁটা ভক্ত-বীর!
শহীদের দেশ! বিদায়! বিদায়!! এ অভাগা আজ নোয়ায় শির!   



  


বন্ধুগণ,

আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে দিলেন, আমি তা মাথায় তুলে নিলুম। আমার সকল তনু-মন-প্রান আজ বীণার মত বেজে উঠেছে। তাতে শুধু একটি মাত্র সুর ধ্বনিত হয়ে উঠেছে

“আমি ধন্য হলুম”, “আমি ধন্য হলুম”।
আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন, যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভাল লেগেছে। বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি। এরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি- এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলে, শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি। কবি চায় প্রীতি। কবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়ে। সুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্ম। তবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছি। শ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যাথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছি। যুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। কারাগারের অন্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছি। ফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি।  


আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেই। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে। ধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।  


কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি, ও দু’টোর কোনটাই নয়। আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে চুরি । হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ ।মানুষের জীবনে এক দিকে কঠোর দারিদ্র-ঋণ-অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মত জমা হয়ে আছে। এ অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান- বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।  


রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন,

”দ্যাখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডী আছে, তুই প্রস্তুত হ’” 


জীবনে সেই ট্র্যাজেডী দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারনে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু, আমারই জীবন রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত দগ্ধ। মেঘের উর্ধ্বে শূণ্যের মত কেবল হাসি, কেবল গান, কেবল বিদ্রোহ। 


আমার বেশ মনে পড়ছে। একদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথা। আমার ছেলে মারা গেছে। আমার মন তীব্র পুত্র শোকে যখন ভেঙে পড়ছে ঠিক সেই দিনই সেই সময় আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছে। আমি প্রানভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে। যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূণ্য থাকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না, আমি সেই নজরুল। সেই নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কী দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পুর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল।  


যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসি নি। আমি নেতা হতে আসি নি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী হতে নিরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে।   

দেশপ্রেমী,ত্যাগী,বীর,বিদ্রোহী- বিশেষনের পর বিশেষন,টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে,বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বোল বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।  


"তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করে সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না।
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ"



কাণ্ডারী হুশিয়ার! - কাজী নজরুল ইসলাম- সর্বহারা

কৃষ্ণনগর; ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৩
দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভূলিতেছে মাঝি পথ,
ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ?
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার!!

তিমির রাত্রি, মাতৃমন্ত্রী সান্ত্রীরা সাবধান!
যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত ব্যথা ঘোষিয়াছে অভিযান!
ফেনাইয়া উঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান,
ইহাদের পথে, নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার!!

অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া, জানেনা সন্তরণ,
কান্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!

গিরি-সংকট, ভীরু যাত্রীরা, গুরু গরজায় বাজ,
পশ্চাৎ-পথ-যাত্রীর মনে সন্দেহ জাগে আজ
কান্ডারী! তুমি ভূলিবে কি পথ? ত্যজিবে কি পথ-মাঝ?
‘করে হানাহানি, তবু চল টানি’, নিয়াছ যে মহাভার!

কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙ্গালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।

ফাঁসির মঞ্চে যারা গেয়ে গেল জীবনের জয়গান,
আসি’ অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, দিবে কোন বলিদান?
আজি পরীক্ষা জাতির অথবা জাতের করিবে ত্রান?
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, কান্ডারী হুঁশিয়ার!




চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!


বাতাসে লাশের গন্ধ

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ---সংকলিত (রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ)

আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাইআজো আমি মাটিতে মৃত্যূর নগ্ননৃত্য দেখি,ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে…এ দেশ কি ভুলে গেছে সেই দু:স্বপ্নের রাত, সেই রক্তাক্ত সময় ?বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসেমাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো।জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর,আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আরষ্ট কুমারী জননী,স্বাধীনতা – একি হবে নষ্ট জন্ম ?একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন।বাতাশে লাশের গন্ধনিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান।মাটিতে রক্তের দাগ -চালের গুদামে তবু জমা হয় অনাহারী মানুষের হাড়এ চোখে ঘুম আসেনা। সারারাত আমার ঘুম আসেনা-তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি ধর্ষিতার করুণ চিৎকার,নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা মানুষের পচা লাশমুন্ডহীন বালিকার কুকুরে খাওয়া বিভৎস্য শরীরভেসে ওঠে চোখের ভেতরে। আমি ঘুমুতে পারিনা, আমিঘুমুতে পারিনা…রক্তের কাফনে মোড়া – কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারেসে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা।স্বাধীনতা, সে আমার – স্বজন, হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন -স্বাধীনতা – আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল।ধর্ষিতা বোনের শাড়ী ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।