মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা আমরা কালুরঘাট বেতার আঁটকে ফেলেছি। অথছ ৭১ এর রণাঙ্গনে অসংখ্য নায়োকচিত যুদ্ধতে মুক্তিযোদ্ধা জিয়া নিজে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অসাধারন
সে সব সাহসিকতার ইতিহাস লিখে বড় সড় একটা পাণ্ডুলিপি হতে পারে। হতে পারে
সামরিক কৌশল ও সাহসিকতার ইতিহাসের গূরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলীল। অথছ জিয়াকে
নিয়ে উল্লেখযোগ্য লেখালেখি খুব অপ্রতুল।
অনেক বড় বড় ১৬ তম ডিভিশনের
মুক্তি যোদ্ধা আছে, প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা আছে যাঁদের জন্য ফ্যামিলি সাইজের
বই ছাপানো হয়, অথছ জিয়া সেখানে অনাদৃত অবহেলিত। এই দলে সেবাদাস ও অজ্ঞানতা
মনোবৃত্তি থেকে নেতা তৈরী হয়। সে কারণে বুদ্ধিবিত্তিক ও ইতিহাসের মূল্যায়ন
থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যার্থতা বারবার আমাদের পেছনে টেনে ধরে। ইতিহাস
শুধু মাত্র পুড়ান দিনের ঘটনার নির্মোহ বর্ণনা নয়, বরং ইতিহাসের পাঠ হচ্ছে
অভিজ্ঞতা অর্জনের ঝুলি। আওয়ামীলীগ যখন এই সব নিয়ে গবেষনারতদের দলীয়ভাবে
সমর্থন দেয় সেখানে আমাদের ইতিহাসের কর্মীদের রীতিমত অবহেলা করা হয়।
যোগ্যদের ছুঁড়ে ফেলেমোসাহেব ও অযোগ্যদের মাথাই তুলে নাচা হয়। সে কারণেই
সিদ্ধান্ত গ্রহণে গাফেলতি ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রায়শ ভুল হয়
আমাদের।
মুল ঘটনাতে আসা যাক
৬ ই জুন, ১৯৭১ সাল-
ফেনী জেলার পরশুরাম থানার সীমান্তের কাছাকাছি চান্দগাজী বাজার ছিল
ক্যাপ্টেন অলির অধীনে একটা মুক্তাঞ্চল। ত্রিপুরাস্থ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর
পূর্বাঞ্চল
কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং, তাঁর দলবল
নিয়ে চান্দাগাজী বাজার মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে আসেন। ডজন খানেক বাংলাদেশী ও
ইন্ডিয়ান সাংবাদিক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং এর পরিদর্শন টিমে।
বাংলাদেশের ওয়ার জার্নালিস্ট আব্দুল বাসার যিনি
“সাপ্তাহিক সমাজ” পত্রিকার
সম্পাদক ছিলেন, তাঁর লিখিত বর্ননা থেকে এই লেখার তথ্য সমূহ থেকে সংগৃহীত।
শাবেদ শিং পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়ে ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে অবসর নেন ও অমৃতসরে স্বর্ণ মন্দিরে ইডিয়ান সেনাদের ঝটিকা অপারেসনে নিহন হন।
শাবেদ
শিং ভারতীয় অফিসারদের গাড়ী বহর সহ নিরাপদ দূরত্বে পাহাড়ী পথ দিয়ে এগুতে
থাকে। পথেই জিয়া শাবেদ শিং কে বললেন চান্দগাজী বাজারে তাদের খাটি বাংলাদেশী
সারপ্রাইজ দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে। শাবেদ শিং ছিলেন অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া
যোদ্ধা, তাঁর অতীত বিভিন্ন যুদ্ধ অভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে দলটি এক সময়
চান্দগাজী বাজারে পৌঁছে যায়।
গোপনীয়তা সত্ত্বেও বাজারের মানুষ
টের পেয়ে যায় বিদ্রহী অফিসার জিয়া সাথে করে ইন্ডিয়ান বিগ্রেডিয়ার নিয়ে
এসেছেন এবং বাজারের সবচেয়ে বড় মিষ্টির দোকানে তাঁরা ঢুকেছেন। ব্রিগেডিয়ার
শাবেদ শিং এর জন্য সারপ্রাইজের সেই বস্তু ছিল চন্দ্রগাজী বাজারের বিখ্যাত
রশগোল্লা। ডাইবেটিকস রোগী ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং মিষ্টি সারপ্রাইজ দেখে
রীতিমত হতাশ হয়ে গেলেন। জিয়া ও অতিথি ইন্ডিয়ান অন্য অফিসাররা ততক্ষনে বিপুল
উৎসাহে মিষ্টির পাতিল থেকে মুখে মিষ্টি পুড়ে ভক্ষণ শুরু করে দিয়েছেন।
শাবেদ শিং অসহায় দৃষ্টিতে তাঁদের রশগোল্লা ভক্ষণ অবলোকন করে যাচ্ছেন।
চান্দগাজী
বাজারে জিয়া এসেছে, সাথে আছে ইন্ডিয়ান ব্রিগেডিয়ার ও একঝাক অফিসার।
পাকিস্তানীদের কাছে কিছুক্ষনের মাঝেই এই খবর চলে গেল। সাথে সাথে বিশাল এক
বহর নিয়ে পাক বাহিনী পশ্চিম দিক থেকে চান্দগাজির দিকে ধেয়ে আসতে লাগল।
বিশাল লোভনীয় শিকার তাঁদের হাতের নাগালে। ভারতীয় ব্রিগেডিয়ারকে ধরতে পারলে
সারা পৃথিবীকে দেখানো যাবে মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু নেই, সব ভারতীয় ষড়যন্ত্র।
তারচেয়েও বড় ব্যাপার জেড ফোর্স কমান্ডার খোদ জিয়াউর রহমান সেখানে আছে। এই
তো সেই গাদ্দার জিয়া যে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে গিয়ে সরাসরি স্বাধীনতা
ঘোষণা দিয়েছে। মার্চ, এপ্রিল মাসে যত পাকিস্তানি অফিসার সৈনিক নিহত হয়েছে
তাঁর বেশির ভাগ মরেছে এই জিয়ার জেড ফোর্সের হাতে।
জিয়ার চান্দগাজী পৌছনোর সংবাদ যেমন পাকিস্তানীরা পেয়ে গিয়েছিল ঠিক তেমনি পাকিস্তানীদের অগ্রসর হবার খবর পৌঁছে গেলো জিয়ার কাছে।
সেই
সময় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের সংবাদ পেলে, মুক্তিকামী জনতা সেখানে আছড়ে
পড়তো। মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে তাঁরা যুদ্ধের গল্প শুনতে চাইতো, আশা
আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্নের কথা শুনতে চাইতো। বাড়ির মুরগী , খাসী জবাই করে
মুক্তিদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা করতে পারলে ধন্য হত। তাঁরা বলতো “মুক্তি
এসেছে”।
তো জিয়ার আগমনের কথা, এক কান দু কান হতে হতে জনতার কানে
পৌঁছে গেলো আবার পাকিস্তানীরাও প্রায় এসে গেছে। ব্যাস মুহুর্তে সবাই উধাও।
বিপদে পড়ে গেলো ভারতীয় অফিসাররা। যুদ্ধ দেখতে এসে সত্যিকারের মৃত্যুন্মুখ
যুদ্ধের মুখে পড়তে হবে তাঁরা ভাবতেও পারেনি।
জিয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে আরো
একটি মিষ্টির হাঁড়ি তুলে নিলেন। পাসে দাঁড়ানো দুই মুক্তিযোদ্ধাকে কিছু একটা
বলে বিদায় দিয়ে, জিয়া হাঁড়ির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন আরো একটা মিষ্টি
খাওয়ার জন্য।
অভিজ্ঞ পাঞ্জাবী ব্রিগেডিয়ার তাঁর জীবনে বহু
যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন কিন্তু এমন ভয়াবহ অবস্থায় কখনো পড়েনি। পাক বাহিনী
ফায়ার ওপেন করেছে, মর্টারের আঘাতে গাছ গুলো ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে, রাইফেল
মেশিন গানের গুলি নিরালস হুংকার দিচ্ছে। পিকনিক আমেজ মুহুর্তে উধাও, জান
বাঁচানো ফরজ কাজ। ওদিকে জিয়া হাড়ি থেকে মিষ্টি সবার করে চলেছেন, আর
অতিথিদের সমানে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে কোন অসুবিধা হবে না, আপনারা বসুন এবং এই
প্রসিদ্ধ মিষ্টি খেতে থাকুন।
শাবেদ শিং বিশাল বপুর মানুষ, তিনি ছোটখাট গড়নের বাংলাদেশী ৪০০ টাকার মেজরের আশ্বাসে আস্বস্ত হতে পারলেন না। Boys, follow me
বলেই মিষ্টির দোকান থেকে লাফ দিয়ে বের হতে গিয়ে পাশের ডোবার মধ্যে পরে
গেলেন শাবেদ শিং। বিশাল বপু শাবেদ শিং, বিশাল সাইজের পাইথনের মত ক্রলিং করে
হাসফাস করতে করতে সীমান্তের দিকে বৃথা রওনা দিতে গিয়ে আবার থেকে গেলেন।
অবশ্য ব্রিগেডিয়ারের ইয়াং অফিসাররা “Boys, follow me” হুকুম পালন করতে পারলেন না। “চাচা আপন প্রান বাচা” থিওরীতে শাবেদ শিং কে একা ফেলে তাঁরা বেশ কিছুটা পিছিয়ে সেফ জোনে ঢুকে গেছে।
মিলিটারি
অফিসারদের মত দৌড়/ক্রলিং এ অনভিজ্ঞ/অনভ্যস্ত সাংবাদিক এবং সিভিলিয়নদের তখন
চোখের সামনে স্বাক্ষাত সাক্ষাৎ আজরাইল। তারপরো জীবন বাচানোর তাগিদে সামনের
পানা পাহাড়ী নালায় পড়ে টুপ টাপ ডুব দিচ্ছেন আর উঠছেন। ফাঁকে ফাঁকে শাপান্ত
করছেন জিয়া আর চান্দগাজীর মিষ্টির দোকানদারকে।
অফিসারদের
সকালের পাট ভাঙ্গা ইউনিফর্মগুলো কাদা পানি আর ধুলায় নাগা সান্ন্যাসীদের মত
প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। কারো মাথাতে তখনো শ্যাওলা, কচুর পাতা ঝুলে রয়েছে।
বিপুল বেগে তারা যখন সীমান্তের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে তখন ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং
জনা দুয়েক সৈনিক আর সাক্ষাতে আসা জন দশেক জনতা নিয়ে পচা ডোবাতে হাবুডুবু
খাচ্ছেন।
কিছুক্ষণের ভেতর রাইফেল বন্দুকের ঝংকার থেমে গেলো।
বাজারের পশ্চিম মাথা থেকে কাদা পানি মাখা কিছু বাংলাদেশী অস্ত্র হাতে দৌড়ে
এসে যখন জিয়াকে কিছু একটা বলে গেলো তখন অতিথিরা নালা আর ডুবা থেকে একে একে
উঠে আসতে শুরু করেছে। তাঁরা যখন এ যাত্রা জীবন বাঁচাতে পারার জন্য স্রস্টার
কাছে শুকুর গুজার করছে, তখন জিয়া মিষ্টির হাঁড়ি শেষ করে গামছা দিয়ে হাত
মুচ্ছেন।
ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং যখন উঠে আসলেন তখন জিয়া নিজের
চেয়ার ছেড়ে দিয়ে, শাবেদ শিংকে বসিয়ে আয়েস করে একটা সিগারেট জ্বালালেন, আর
ব্রিগেডিয়ার সাহেব কে একটা সিগারেট এগিয়ে দিতে দিতে বললেনঃ
“ওদের
রওনা দেবার খবর পাবার আগেই নিরাপত্যার কথা ভেবে বাজারের কাছে এ্যম্বুস
পেতে রেখেছিলাম আমরা, তাঁরা এই ফাঁক দিয়ে আসতে পারে এমন একটা ধারণা আমরা
করেছিলাম”
পাকিস্তানীরা আসার খবর শোনা মাত্র
এ্যামবুশকারীদের সাবধান করে জিয়া ওই দুই সহযোদ্ধাকে নির্দেশ দিয়ে এ্যটাকের
প্রস্ততি নিতে বলেন। পাকিস্তানী বাহিনী এ্যামবুশের মাঝে আসা মাত্র দুই ধারে
সাব-মেশিন গানের গুলি শুরু করে ক্যাপ্টেন অলির বাহিনী। খুব অল্প
পাকিস্তানী সেনা সেদিন ফেরত যেতে পারে। জিয়া তখন হাসতে হাসতে সবাইকে বলেনঃ
“এবার যান, সবাই গিয়ে লাশ গুলো আর পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া গাড়ি গুলো দেখুন।”
ব্রিগেডিয়ার শাবেদ শিং এরপর “সাপ্তাহিক সমাজ” পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক বাশারকে ইটারভিউ দিতে গিয়ে ইংরেজীতে বলেনঃ
“ডিয়ার
সাংবাদিক, যুদ্ধে তোমরা অবশ্যই বিজয়ী হবে। যে জাতির হাতে মেজর জিয়ার মত
একজন কমব্যাটেন্ট থাকে তাদের দমিয়ে রাখা যায় না। আমি নিজে অনেক যুদ্ধ
করেছি, অনেক যুদ্ধের কৌশল নিয়ে পড়েছি, কিন্তু জিয়ার মত ঠান্ডা মাথার
কমব্যাটেন্ট কোথাও দেখি নি”
এ্যাডভেঞ্চার শেষে ভারতীয় বাহিনীকে ত্রিপুরা ফেরত নিয়ে যাবার সময় সাংবাদিক বাশার এক পর্যায়ে জিয়ার পাশে এসে বলেনঃ
“স্যার আজকের ঘটনার ওপর কিন্তু কাভার ষ্টোরী হবে। কালো সানগ্লাসে ঢাকা চোখের স্বভাব সুলভ মুচকি হাসিতে, জিয়া প্রচ্ছন্ন সাঁয় দিয়ে বলেনঃ
Well, you’ve a story, no doubt. But please don’t mention our name. That’s our of military rules.
“ওয়েল ইউ হ্যাভ আ ষ্টোরী। নো ডাউট। বাট প্লীজ ডোন্ট মেনশান আওয়ার নেইম। ওটা আমাদের সামরিক নিয়মের বাইরে।”