শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৩

Failior is the key to success

Failior is the key to success


শয্যা-সঙ্গী



২১ বছর বয়সে তিনি ব্যবসায়ে লস করেন।
২২ বছর বয়সে তিনি রাজনীতিতে পরাজিত হন।
২৩ বছর বয়সে আবারও ব্যবসায়ে লস করেন।
২৬ বছর বয়সে হারান প্রিয়তমা স্ত্রীকে ।
২৭ বছর বয়সে তার নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়।
৩৪ বছর বয়সে কংগ্রেস নির্বাচনে হেরে যান।
৪৫ বছর বয়সে সিনেট নির্বাচনে হেরে যান।
৩৭ বছর বয়সে ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হলো।
৪৯ বছর বয়সে আবারও সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হন।
এবং ৫২ বছর বয়সে তিনি হন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।

তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন।
এতগুলো হারের পরও যিনি কখনো ভাবেন নি, রাজনীতি আমার জন্যে নয়। আর তাইতো তিনি হতে পেরেছিলেন আমেরিকার সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্টদের একজন।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

আসবে আর যাবে ; থাকবে না।

Sex life & democracy 

শয্যা-সঙ্গী

সু-প্রভাত বাংলাদেশ। কংগ্রেচুলেস্নস বাংলাদেশী । অভিনন্দিত হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে আমাদের।আমরা দ্বি- জাতি ফর্মুলা ভেঙ্গে আন্দলন করেছি। ১৯৭১ এ  "এ বারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম " এর গণ জোয়ার দেখেছি। ২৫ মারচ এর Operation searchlight এর বীভৎসতা অতিক্রম করে কালুরঘাট বেতারের "Revolt" শুনে Revolt করতে শিখেছি। 
বেসামরিক বেক্তি দের সশস্ত্র হাতে "কাদেরিয়া বাহিনি" কে দেখেছি Long course করা Disciplined force কে অসহায় করে তুলতে। আরও দেখেছি স্বাধীনতার সংগ্রাম এর অন্তরেও  ক্ষমতার লালসা , সেখানে জন্ম নেয়া "রক্ষী বাহিনী" "মুজিব বাহিনী" । ক্যান ক্যাদের কি প্রয়জনে এই সব বাক্তি কেন্দ্রিক বাহিনী গঠন করে মুক্তির যুদ্ধে "মুক্তি বাহিনী" র পাশে এদের স্থান দেয়া হয়েছিল। 
এতকিছুর পর এলো 'Count down "টাইম , ১৬ই December 1971. Res course এ " Witness to surrender " হবার মহান সময়। এই পুরো ৯ মাস এই মুক্তি যুদ্ধের প্রধান সেনাপতির নাম "M.A.G Ausmani" তাইতো বন্ধুরা । এই Surrender এর একটা ছবি আমাদের সবার মনে গেথে আছে "ণেয়াজি ও অররা" Signature করছে এবং অন্যান্য রা তাঁদের ঘিরে আছেন ; তাই তো !!
আমার জানার ইচ্ছা এই খানে "কর্নেল ওসমানী " কোঁথাই। ক্যান তিনি নাই? তিনি নিজেই আসেন নায় ; এটা কি বিশ্বাস যোগ্য ? দুষ্টু জনেরা বলেন তাঁকে Res-course এ আসতে দেইনাই Indian Military , পাছে তাঁদের + Point মুক্তি যোদ্ধা দের কাছে চলে আসে। থলের বিড়াল বাহিরে প্রকাশ হবার Tension তো তাঁদের থাকতেই পারে। 

যুদ্ধ শেষে সৈনিক বা ব্যারাক এ ফিরে গেল ।শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবল বাক্তিত্তের মুখে মাত্র ৩ মাসে Indian Force backed to pavilion . কারণ সম্ভবত এই যে India তে  অবস্থিত বাঙ্গালী এবং নকশাল পন্থী দের উপর শেখ সাহেবের অসীম প্রভাব। এমন কি প্রবীণ এরা বলেন India রা West bengal ও Tripura province কে চাইলেই তিনি প্রভাবিত করতে পারতেন ; তা Indira Gandhi বেশ ভালভাবেই বুজতেন ।
তবে তাঁরা খালি হাতে যাই নি ; যাবার সময় বাংলাদেশী দের ভালবাসার সাথে সাথে  Pakistan Army দের আধুনিক War Material গুলিও নিয়ে গেছে। 

এই সময়ের পরের ৩/৪ বছরের সমালচনা না করাই উত্তম।কারন সেই সময় টা যুদ্ধ বিসধস্ত একটা দেশের সময় ; তবুও তো কথা থেকেই যাই। "বাক শাল" এর কথা তো মনে করতেই হবে  কারণ বাক শাল ছিল মুক্তি যুদ্ধের মূল চেতনার থেকে ভিন্ন। হইত Pakistan Government এর সাবেক মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এই বাক শালের ধারণাটা Pakistan এর শাসক শ্রেণীর মানসিকতা থেকেই প্রভাবিত হয়ে অন্বেষণ করেছিলেন ।

এর পড়ই ১৯৭৫ এর UN-finished Revelation [দুষ্টরা বলেন  :-( ] , খন্দকার মুস্তাক এর মন্ত্রী সভা গঠন , ক্যু এবংCounter ক্যু , ক্যু ক্যু আর ক্যু । সিপাহী জনতা বিপ্লব । কর্নেল তাহের এর পর নির্ভর প্রচেষ্টা শেষ বিচারে লৌহমানব জিয়াউর রহমান এর ক্ষমতা গ্রহণ। শেখ হাসিনা ও গোলাম আজমের বাংলাদেশে প্রতারপন । বাক শাল বাতিল , Indemnity act জারি। বহুদলীয় জনতন্ত্র পুনঃ বহাল  । 

আবারও ক্যু  , মেজর মঞ্জুরের মৃত্যু , Re- patriot এরশাদের Conspiracy এবং বিচারপতি সাত্তারের পুতুল BNP সরকার। এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ । শেখ হাসিনা বললেন " I'm not un happy" ...

এরশাদ বিরধি আন্দালন । ৮৬ র নির্বাচন , আন্দালনের পিঠে  "Stape from the back" আরও অনেক কিছু। 
৭ দলের ৮ দলের ৩ দলের জোট । ৩ জোটের রূপরেখা , এরশাদের পতন । প্রথম Fair election .BNP এর সরকার গঠন। তত্ত্বাবধায়কের আন্দালন , আউয়ামিলিগের ক্ষমতা গ্রহণ , BNP এর পুনুত্থান  ও পতন , নি-রাজনিতিকি করনের বার্থ চেষ্টা আবার আউয়ামিলিগের উত্থান BNP এর মহা পতন এবং আবারও আউয়ামিলিগের পতনের আগাম শব্দ ; সেই সঙ্গে Bnp এর উত্থানের পুরানো গল্প। 

তাহলে গণতন্ত্রটা কোঁথাই ? 
দাদা তাঁর আদরের ৩বছ্রের নাতি এর ৫ বছরের নাতনী কে নিয়ে ঘুমান। নাতি যখন রাতে হুসু করার কথা বলে ; দাদা তাকে  জানালার পাশে দাঁর করিয়ে দেন ; নাতনী হিসু দিতে চাইলে তাঁর জন্য ঘরের কোনে কলস রাখা আছে। ছোট্ট নাতনী এই বিভাজন মানতে পারে না ; সে প্রতিবাদী হয়ে উঠে  , সে তাঁর ভায়ের মত জানালার কাছে এগিয়ে যাই। দাদা র ডাকে তাঁকে দাড়িয়ে যেতে হয়। ছোট্ট বালিকার মুখমণ্ডলে  প্রতিবাদের ভাজ  চোখে কান্না সেও জানালা তে দাড়িয়ে সিসু করলে বুড়া দাদার আপত্তি ক্যান? 

বিদগ্ধ দাদা নাতনী র কষ্টে বাথিত । অপারগ সে । নাতনী র জন্য তাঁর একটাই কথা " দাদু তোমার তো ঐ টা নাই " 
বিস্মিত নাতনী !!! ক্যান নাই দাদু ??
"কান্দিস না মেয়ে ; নাই তো কি হয়েছে !! বড় হ ; তখন অনেক পাবি ; যত ইচ্ছা তত পাবি "

নাতনী দাদার কথার মাথা মুণ্ডু না বুঝেই মাথা ঝাঁকাল।

দাদুই শুধু জানেন সুভ-আঙ্কের ফাকির কথা টা।
দাদা নতি ও নাতনী কে নিয়ে ঘুমিয়ে পরল । সূর্য মামা আবার হাজির ।দাদা নাতনী কে ডেকে তুলে বলল ' শোন ছেরি বড় হ অনেক পাবি ; যত চাস তত পাবি ; আফসেস করবি না ; ওঁটা শুধু আসবে আর যাবে থাকবে না।"

হাইরে Bangladesh !! তোর গণতন্ত্রও আসবে আর যাবে থাকবে না !!! আফসস করিস না ; আফসসে  ফাইদা নাই।।

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

Revolt

Revolt    [collected]

শয্যা- সঙ্গী

এটা কোনো রাজনৈতিক আলোচনা নয়। এই পোষ্ট গুলোতে, প্রথম দিকে খুউউব অল্প জিয়া এসেছেন, আমার দেখা জিয়া, আমার শোনা নয়। আওয়ামী লীগ ও বি এন পির কট্টর সর্মথকদের আমার এই সংক্রান্ত পোস্টগুলোকে এড়িয়ে যাবার জন্যে সবিনয় অনুরোধ করছি।
এই আপডেট প্রথমেই বিএন পি পন্থী এবং কিছু পরে আওয়ামী লিগ পন্থীদের আহত করতে পারে বলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।


যে সময়ে আমি এটা লিখছি, ৩২ বছর আগে ঠিক সেই সময়্‌ ১ দিন আগে আমি ময়নামতি সেনানিবাস(কুমিল্লা)এর টিপরা বাজার বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। আমার সেনাদলের ছয় মাসের জেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাকে তার মোটর বাইকে লিফট দিয়েছেন। তাঁকে আমি বললাম যদি চিটাগাংএর বাস আগে আসে তা'লে আমি চিটাগাং আর ঢাকার বাস আগে আসলে আমি ঢাকায় যাব। পিতার প্রথম স্থাবরটি ঊনি বছর খানেক আগে চিটাগাংএই বানিয়েছেন যা আমি তখনো দেখিনি আর আমার পরিবারের সবাই তখন ঢাকায় থাকেন।

ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন হওয়ায় ঢাকার বাস আগে আসলো।

চাকুরী ২ বছর ১১ মাস।

২ বছর ১১ মাসে আমি মোট ২ দিন ১১ ঘন্টা ছুটি পেয়েছি কিনা সন্দেহ। তখন এক একটা সেনাদলে ৫/৬ জনের বেশী কর্মকর্তা থাকতো না যেখানে আমার সেনাদলে ২৭ জন থাকার কথা। তাই ছুটি ছিল সোনার হরিন,আর অবিবাহিত হ'লে তো ছুটির প্রশ্নই নেই। বাসে চড়ে আমি আমার ভাগ্যকে বারবার ধন্যবাদ দিচ্ছিলাম প-নে-রো দি-নে-র ছুটি পাবার জন্যে। এ ক'দিনে কি কি করবো বার বার তার পরিকল্পনা করছিলাম আর বার বার বদলাচ্ছিলাম, তবে একটা ব্যাপারে স্থির ছিলাম যে সাত বীর শ্রেষ্ঠের মধ্যে যাদের কবর বাংলাদেশের মাটিতে সেগুলো দেখতে যাবো।

কখন যে পিপল ট্রান্সপোর্টের বাসটি গুলিস্তানে পৌঁছুল বুঝতেই পারলাম না। সন্ধ্যা লাগার আগেই বাসায়।

বাবা দেশের বাইরে তাই বাসা গমগম করছে। সারারাত ভাই বোন আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে আসর যখন ভাংগলো তখন কাক ডাকা ভোর।

আমি ঘুমুতে গেলাম।

পুর্ব কথন-রাজনীতি বিস্ময়কর শয্যা সংগী সৃষ্টি করে।

সে বছরেরই (১৯৮১)ফেব্রুয়ারীতে আমি আমার সেনাদল নিয়ে ঢাকায়- স্বাধীনতা দিবস কুচকাওয়াজের জন্যে। দিনে দুটো মহড়ার পর আর কিছু করার থাকতনা। পুরোনো বিমান বন্দরের এক কোণে আমাদের ক্যাম্প। ক্যাম্প থেকে হাঁটা পথে ১০ মিনিট দূরে আমাদের বাসা। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!

তখন সশস্ত্র বাহিনী দিবস ছিল না। তিন বাহিনী তিনটি আলাদা দিন পালন করতো। সেনা বাহিনী দিবস ছিল ২৫ শে মার্চ। সে দিবসটি ঊপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি এবং সশস্ত্র বাহিনী প্রধান আমাদের নিমন্ত্রণ করেছেন (কন্টিঞ্জেন্ট কমান্ডার হিসেবে) । স্থান অফিসার্স ক্লাব, ঢাকা সেনানিবাস (এখন কুর্মিটোলা গলফ ক্লাব)। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর পৌছুলাম। অতিথি অত্যন্ত বেশী, জায়গার তুলনায়। নড়াচড়া করার ঊপায় নেই (তখন সেনা কুঞ্জ ছিল না)। ধাক্কায় দুবার মেঝে থেকে মাঠে চলে এলাম। খুব সম্ভবতঃ আমিই সেখানে সর্ব কনিষ্ঠ আমন্ত্রিত কর্মকর্তা।

রাত আটটার দিকে হঠাৎ ক্লাবের মাঝখান থেকে শোরগোল উঠল- ঠেলায় ঠেলায় আমি তখন শোরগলের কাছেই। তাকিয়ে দেখি রষ্ট্রপতি লেঃ জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বেশ কিছু অফিসার ঘিরে ধরেছেন এবং উচ্চ স্বরে তর্ক করছেন।

কেউ একজন চিৎকার করে উঠলেনঃ Sir, how could you make RAZAKAR Shah Aziz the Prime Minister of our country(স্যার, আপনি রাজাকার শাহ আজিজকে কি করে দেশের প্রধান মন্ত্রী বানালেন)?

জেনারেল জিয়ার তাৎক্ষণিক উত্তরঃ Politics make strange bed fellows!

ভীড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বললেনঃ Sir you have to pay for it (স্যার এ জন্যে আপনাকে মূল্য দিতে হবে)।

..and he paid with his life. তাকে মূল্য দিতে হয়েছিল- নিজের জীবন দিয়ে- মাত্র দু মাস পাঁচ দিনের মাথায়।
স্বাধীনতার পর থেকেই দেখছি-মুক্তি যোদ্ধারা যেন কে কার আগে মরবেন তার প্রতিযোগিতায় মেতেছেন-আজ অব্দি দেখছি।

যারা এখনো মনে করছে যে এটা একটা রাজনৈতিক পোষ্ট তাদের জ্ঞাতার্থে আমি বলছি যে আমি এখানে রাজনৈতিক আলোচনা টেনে আনাটা আমি পছন্দ করছিনা। আমি ধান ভানতে শীবের গীত গাওয়াও আমার অপছন্দের।

আরাকটা কথা। এখানে যারা আসছেন তার মধ্যে বিরাট একটি অংশের কাছে জিয়াউর রহমান একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্র।

বংগবন্ধুকে যারা ভালবাসেন একবার চিন্তা করে দেখবেন বংগবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করলে আপনাদের কেমন লাগে।
এখানে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি করবেন না অনুগ্রহ করে।

আমার মন্তব্য যখন কেউ মুছে দেয় আমি তখন অপমানিত বোধ করি।

এবং অতি অবশ্যই ঘৃনাজীবীদের সাথে আমারর কোনো সম্পর্ক নেই।

৩২ বছর আগে, গত ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট মোসওলেহ উদ্দিন যখন সার্কিট হাউজের একটা দরজায় ধাক্কা দেয় তখন সাদা পাঞ্জাবী পরা জেনারেল জিয়া দরজা খুলে দেন। মোসলেহ শুধু বলা শুরু করেছিল যে তাকঁকে সেনানিবাসে নিয়ে যেতে তারা এসেছে। এমন সম্য প্রচন্ড এক ধাক্কায় মোসলেহ মাটিতে পড়ে যায়।

শুয়ে শুয়ে দেখে যে অকথ্য ভাষায় গালিলাজ করতে করতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতি, জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেইড-১, ২৪ পদাতিক ডিভিশন, জিয়াউর রহমানের শরীরের ঊপর থেকে নীচ point blank range থেকে গুলি করে ৩০ রাউন্ডের ম্যাগাজিন খালি করে।

জিয়ার শরীর ঝাঝরা হয়ে যায়। তিনি গুলির ধাক্কায় ফুট খানের পেছনে চলে যান এবং চিৎ হয়ে পড়ে যান।
তখনি তার মৃত্যু ঘটে।  লেফটেন্যান্ট মোসলেহ উদ্দিন।

_____________________________________________________________________

৩০ শে মে, ১৯৮১।

সকাল দশটায় ছোট ভায়ের প্রচন্ড ধাক্কায় ঘুম ভাংগলো। বাসার সবাই আমার খাটের চার পাশে। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে চিটাগাং এ মেরে ফেলা হয়েছে- ছোট ভাই ঘোষনা করলো। লাফ দিয়ে করে উঠে পড়লাম। মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঊঠলো

একসাথে অনেক স্মৃতি ভীড় করলো- ১৯৭৫এ ডিসিএএস থাকা অবস্থায় আমাদের কলেজ পরিদর্শন যেখানে আমাদের সিনিয়র ব্যাচ অনুপস্থি্ত থাকাতে আমারাই (ক্লাস ইলেভেন-১৯৭৫) ছিলাম জেষ্ঠতম, আমাদের সাথে তাঁর মধ্যাহ্ন ভোজ, ভোজ শেষে ডাইনিং হলের সামনে আমাদের সাথে তার গ্রুপ ছবি, তাঁর এডিসি ক্যাপ্টেন জিল্লুর (পরে ব্রিগেডিয়ার, প্রয়াত), আমাদের ড্রিল প্রশিক্ষক হাবিলদারের সাথে তাঁর আন্তরিক কথোপকথন........... .....................................................যশোর সেনানিবাসে সেকেন্ড লেফটেনেন্ট থাকা অবস্থায় শুধু মাত্র তাকে বিব্রত করতে আমার প্রশ্ন করাঃ Sir, just the other day you came back from a visit from India, would you please tell us what all good qualities you have marked among Indians (স্যার, আপনি মাত্র ভারত সফর করে এলেন, ভারতীয়দের মধ্যে কি কি ভাল গুণ লক্ষ্য করেছেন)? আমার দিকে অনেকক্ষন(আমার মনে হয়েছিল এক যুগ, আসলে বোধ হয় পনেরো সেকেন্ড) এক দৃষ্টে (যদি ভাষায় প্রকাশ করতে পারতাম কী ভয়াবহ, কী অপ্রাকৃত সে দৃষ্টি)) তাকিয়ে থেকে উনি স্মিত হেসে, অতি সপ্রতিভ উত্তর দিলেন "They have patriotism, we don't have (ওদের দেশপ্রেম আছে আমাদের নেই)" ....................,....................................................................................................... "ভারতের বিরুদ্ধে যদি যুদ্ধেই যেতে হয় তা'লে আমাদের সেনাবাহিনীর একমাত্র ঊপায়- অনিয়মিত যুদ্ধ (unconventional warfare-1980)" সেটা ছিল তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসুত- এবং সে যুদ্ধের প্রথম এবং শেষ প্রশিক্ষনের সময় আমাদের সেনাদলে তার পরিদর্শন এবং তাঁর সামনে আমাদের কামানবাহী ভেলার খরস্রোতা গোমোতীতে ঢুবে যাওয়া ............................... ................................মাসেক পরেই ৪৪ পদাতিক ব্রিগেড কমান্ড পোষ্টে তার সাথে লালমাই পাহাড়ের খরগোসের মাংস দিয়ে নৈশ ভোজন, আমাদের প্রশিক্ষণে তাঁর ক্যাবিনেটের দুই সদস্যকে সারা রাতের জন্যে রেখে যাওয়া কটাক্ষ করে "আপনারা (মন্ত্রীদ্বয়) তো মনে করেন আর্মিরা হারাম খায়..............." .................. ....................................................২৫ শে মার্চ, ১৯৮১ র রাতে তাঁর সাথে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের অনেক বিষয়ে বিতন্ডা (ততদিনে জেনে গেছি শাহ আজিজ ছাড়া আর কি কি বিষয়ে তাঁর সাথে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের তর্ক হয়েছিল সেদিন)............... ....................................................................................................
হাত মুখ ধুতে ধুতেই স্থির করলাম এ অভাবনীয় পরিস্থিতিতে আমার কি করতে হবে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ছুটি এ ধরনের পরিস্থিতিতে আপনা আপনি বাতিল হয়ে যায় (মন্ত্রীদের যায় কিনা সে ব্যাপারে আমি যথেষ্ঠ সন্দিহান-সোহেল তাজ বিডিআর হত্যা কান্ডের সময় ছুটিতে ছিলেন, পুরো ছুটি কাটিয়ে ফিরেছিলেন)।

ড্রুইংরুমে টিভি চলছিল। বিচারপতি সাত্তার শ্লেষ্মা জড়িত, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে চলেছেন ".......একদল দূষ্কৃতকারী.....................যারা যারা আগামী পহেলা জুন সকাল ৬টার মধ্যে আত্মসমর্পন করবে তাদেরকে সাধারন ক্ষমা .................. ।

লাইন না পেয়ে সাড়ে দশটার আগেই ফোনে যোগাযোগ করলাম সেনাসদরে । উত্তর এল যে আমি সেনাসদরেও যোগ দিতে পারি আর ইচ্ছে করলে ময়নামতিতে চলে যেতে পারি।

আমি গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া চলে গেলাম। আন্তঃ জেলা কোন বাস না পেয়ে ওখান থেকে গেলাম কমলাপুর, দুপরের কোন ট্রেন যদি ধরতে পারি, পুরো প্লাটফর্ম খা খা করছে। ঈদের দিনেও কমলাপুর এত ফাঁকা থাকেনা। এমন কি একটা ফকিরও নেই। টিকেট কাঊন্টারে কাঊকে না পেয়ে স্টেশন মাস্টারের অফিসে ঢুকলাম। একটা রেডিওর চারপাশে কয়েকজন জড়ো হয়ে কি যেন শুনছে। আমি আমার পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম ট্রেনের খবর। মাস্টার জানালেন চিটাগাংগামী সব ট্রেন যাত্রা বাতিল হয়েছে। রাত ন'টায় নোয়াখালী এক্সপ্রেসে আমি কুমিল্লা যেতে পারি। টিকেট কেটে বাসায় ফিরে এলাম। আবার চেষ্টা করলাম কুমিল্লায় কথা বলতে, না পেরে সেনাসদরে ফোন করে জানালাম আমার খবর। আমাকে জানানো হ'ল যে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে আমার ডিভিশন সদরে (৩৩ পদাতিক ডিভিশন) জানিয়ে দেয়া হবে আমার খবর।

বাসায় রান্না চড়েনি। ক্ষিদেও নেই। আমি ৩৫/এ, ইন্দিরা রোডের(এখন ধানসিঁড়ি এপার্টমেন্টস) সেই বাসার ৯টি কুল গাছের একটির নীচে বসলাম, একা--জিয়ার প্রতি কোন বিশেষ দুর্বলতা আমার ছিল না, কিন্তু গলা আমার ধরে এল, চোখ বাস্পাচ্ছন্ন হয়ে গেল। নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম আমি।

সেদিন ছিল সম্ভবতঃ এইচ এস সি র শেষ পরীক্ষা। আমার মনে আছে এই জন্যে যে আমার স্ত্রী (তখনো নয়) সে পরীক্ষা দিচ্ছিল। তো, পনেরো দিনের ছুটিতে এসে তার সাথে দেখা না করেই আমি আবার ফিরতি পথে।
সারা ঢাকার রাস্তা খালি । আমি সাত মিনিটে ইন্দিরা রোড থেকে কমলাপুর পৌঁছুলাম।
নোয়াখালী এক্সপ্রেসের আমার পুরো বগীর যাত্রী ছিলাম শুধু আমি। টংগীতে আমাকে আমার কামরার এটেন্ডেন্ট জানায় যে সে ট্রেনে মোট যাত্রী সংখ্যা সে রাতে সাকুল্যে ৯ জন।

কাটায় কাটায় রাত ন'টায় অনিশ্চিত গন্তব্যে যাত্রা করলাম। কোন উত্তেজনা নেই, কোন উদ্দিপনা নেই, নেই কোন প্রনোদন......নিজেরা নিজেরা মারামারি করতে চলেছি....বুক ভরা হাহাকারের সাথে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস........... ।

 মগজ মৃতদের এই পোষ্ট না পড়ার জন্যে সবিনয়ে অনুরোধ করছি।

করেই বা কি লা? যারা মগজ মৃত তারা কি আর আমার এই অনুরোধের মর্মার্থ করতে পারবে?
অতি বংগবন্ধু প্রেমে আর অতি জিয়া জোসে এই অরাজনৈতিক নিরিহ পোষ্টটির অকাল মৃত্যু ঘটাবেন না দয়া করে।
একটা কথা তো ঠিক যে আমি উপরোধেই ঢেঁকি গিলছি।
এই স্মৃতি চারন মানসিকভাবে আমাকে অসুস্থ্য করে দেয় যারে কারনে আমার চিকিৎসা নিতে হয়।
এই পোষ্টে যুদ্ধ করতে থাকলে আমি এই বিষয়ের পোষ্ট দেয়া বন্ধ করে দেবো।

৩১ শে মে, ১৯৮১।

ট্রেনের রাত্রির যাত্রা আমার এক্কেবারে পিচ্চি থাকতেই ভীষন পছন্দ। ট্রেনের দুলনিতে খুব গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই আমি। এখনো যেখানে ঢাকায় থাকতে রোজ ঘুমুতে ঘুমের অষুধের প্রয়োজন হয়-কিন্তু তূর্ণা নিশিথা চলা শুরু করার পাঁচ মিনিটে ঘুমিয়ে পড়ি, সেখানে সে রাতে ঠায় বসে রাত পার করে দিলাম। স্টেশনে নেমে কোন বাহন না পেয়ে হেঁটে শাসনগাছা পর্যন্ত এসে একটা রিকসা ঠিক করতে পারলাম। পাহাড়ের ঢালে, আমার মেসের কাছে যখন রিকসা থেকে নামলাম, তখন ঘড়িতে (সেল ফোনের যুগ শুরু হবার পর ও বস্তু আর ব্যাবহার করা হয় না) সকাল চারটা বিশ। দ্রুত ইউনিফর্মে তৈরি হয়ে ইঊনিটে (সেনাদলের সেনানিবাসের অবস্থান) গেলাম। পুরো ইঊনিট খা খা করছে। শুধু সহ অধিনায়কের অফিসে বাতি জ্বলছে। সহ অধিনায়কের কাছে যেতেই উনি বল্লেন; " তোমার আসার খবর বিকেলের দিকে ব্রিগেড সদর থেকে পেয়েছি, সাথে তোমার সংযুক্তির আদেশ। তোমাকে ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের অস্থায়ী জি এস ও-৩ {অপারেশন সংক্রান্ত নিয়োগ যা তখন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া সবখানের পদাতিক ব্রিগেডে suspended animation (পোস্ট ছিল নিয়োগ ছিল না)এ ছিল} নিয়োগ দেয়া হয়েছে আজ পূর্বাহ্ন থেকে। ব্রিগেড ট্যাক্টিক্যাল হেড কোয়ার্টার এখন ফেনী শহরে, বি ডি আর সদর দপ্তরে। সকাল সাতটার মধ্যে তুমি ব্রিগেড মেজরের সামনে উপস্থিত থাকবে।

একটা পিক আপে আমার সমস্ত সম্পত্তি ( ২ জোড়া ইঊনিফর্ম, ২ টি ট্রাউজার, ২টি শার্ট, ২ টি সর্টস, ২ টি টি-শার্ট, ১ জোড়া চপ্পল আর আমার প্রাণ প্রিয় ছোট্ট একটি কেসেট প্লেয়ার সাথে অনেক কেসেট) নিয়ে আমি আমার গাড়ি চালক আর ওয়্যারলেস অপারেটরকে নিয়ে রওয়ানা দিলাম।

বি ডি আর সদর দপ্তরে ব্রিগেড মেজর (বি এম)আমকে অপারেশনাল ব্রিফিং দিলেন। যার সার কথা ছিল সেনা সদর থেকে ৩৩ পদাতিক ডিভিশনকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে চিটাগাং এর ২৪ পদাতিক ডিভিশনকে আত্ম সমর্পন করানো। ৩৩ পদাতিক ডিভিশন সে দ্বায়িত্ব দিয়েছে ৪৪পদাতিক ব্রিগেডকে। ভোর পাঁচটায় ৬ ইস্ট বেংগল (অধিনায়ক মুক্তি যোদ্ধা লেঃ কর্ণেল শাহ মোহাম্মদ ফজলে হোসেন, ৩০ শে সেপ্টেম্বর '৮৩ তে শারিরিকভাবে সম্পূর্ণভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়)এর এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন হায়দার ৭০ জন সৈনিক ও ২ জন জে সি ও (নায়েব সুবেদার/সুবেদার/সুবেদার মেজর) নিয়ে শুভপুর সেতু পার হয়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। শুভপুর সেতুর এপারে আমার সেনাদল আর ওপাড়ে ৬ ইস্ট বেংগল- একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে আগের দিন থেকে। আমার কাজ হবে আত্মসমর্পনের পুর্নাংগ ব্যাবস্থা, তদারক ও নিশ্চিত করা। আমি উত্তরে বললাম যে ২৪ পদাতিক ডিভিশন কুমিল্লা, যশোর ও রংপুরের সম্মিলিত ডিভিশনের সমান। ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের মতো অসম্পূর্ণ একটা ব্রিগেড কিভাবে সে ডিভিশনকে সারেন্ডার করাবে? উনি পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন "এত বিশ্লেষনী ক্ষমতা থাকতে আমি কেন বুদ্ধিজীবী না হয়ে সেনা বাহিনীতে আমার পশ্চাদদেশ ঘষতে এলাম (to rub your ass)?

আমার অস্থায়ী অফিসে স্থিতু হয়ে বসতে না বসতেই ক্যাপ্টেন হায়দার (আমার ছয় মাসের জেষ্ঠ)ঢুকলেনঃ একটা মাইক্রো রিকিউজিশন করো (৪৪ পদাতিক ব্রিগেডকে ততক্ষণে সে ক্ষমতা পেয়ে গেছে) আমি ওপার থেকে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদারকে {৬ ই বেংগলের সহ অধিনায়ক, repatriated (পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত )} ঊঠিয়ে নিয়ে আসি, সাথে ব্যাটালিয়ানের গুরুত্বপূর্ণদের। তাহ'লে আপনা আপনিই ডিফেন্স খালি করে সবাই চলে আসবে এপাড়ে। একটা ২২ সিটার মাইক্রো আনা হ'ল তাতে ট্যাংক ভর্তি করে পেট্রল ভরে ক্যাপ্টেন হায়দার চলে গেলেন। আমার রানার (বেসামরিক পিওনের সমার্থক বলা যেতে পারে) তিন ব্যান্ডের একটা ট্রাঞ্জিস্টার (রেডিও) নিয়ে আমার অফিসে ঢুকল। বি বি সি থেকে বলছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভারতীয় সেনারা অনুপ্রবেশ করছে। তাদের সংখ্যা বিশাল (with great strength) । আমি বি এম কে জানালাম। উনি তখনকার জনপ্রিয় ফিলিপস ২০ ব্যান্ডের একটা রেডিও কোত্থেকে যেন জোগাড় করলেন। আমর আবার শুনলাম।

ভয়াবহ পরিস্থিতি। পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন সেনা দলের সাথে আমাদের কারো যোগাযোগ নেই যে আমরা খবরটি যাচাই করবো। গুজব বলেও ঊড়িয়ে দিতে পারছিনা- বি বি সি বলে কথা! অনুমান করছি যে রাষ্ট্রপতির ঘোষনা শুনে পার্বত্য চট্টগ্রামের যুদ্ধরত সবাই কুমিল্লার পথে। এদিকে ডিভ সদর ও সেনাসদর থেকে ক্রমাগত চাপ আসছে সঠিক তথ্য জানানোর জন্যে।

ব্রিগেড অপারেশন রুম (অপস রুম)। চার দেয়াল জুড়ে মেঝে থেকে ছাঁদ পর্যন্ত নানা মাপের ম্যাপ-চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের। ইন্টেলিজেন্স হাবিলদার তার সহকারী নিয়ে চিটাগাং ডিভের deployment (সেনা মোতায়েন) আঁকতে ব্যাস্ত।, যদিও সে deployment ততক্ষণে কাগুজে, আসলে কে কোথায় কেউই জানেনা। ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান (পরে মেজর জেনারেল, তুরস্কে রাষ্ট্রদুত থাকা অবস্থায় প্রয়াত, দেলদুয়ারের Theif of Bagdad নন), বি এম, বি ডি আর ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মেজর বিখাঊজ, ত্থুক্কু মেজর দাউদ (তখন বি ডি আর ব্যাটালিয়ান গুলো কমান্ড করতো মেজররা) আর আমি। সবাই মিলে উপায় বের করার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম আমি ছাড়া আর যারাই তখন অপস রুমে -সবাই প্রত্যাগত, এমনকি ব্রিগেড কমান্ডারের রানার পর্যন্ত!

হঠাৎ বি এম বলে উঠলো ' স্যার! বি ডি আরের ওয়্যারলেস নেট ওঅর্ক তো খুবই শক্তিশালী, আমরা ওদের সেট দিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি না কেন? তাছাড়া হিলে তো ওদেরও deployment আছে। শুরু হয়ে গেল কাজ। বি ডি আরের ছিল তখন ফিক্সড ব্যান্ড সেট- CD- 100. চারটি ব্যান্ডে কথা বলা যেত। ঝকঝকে নতুন ছোট্ট ব্রিফ কেসের মত দেখতে এ সেটগুলোর রেঞ্জ ছিল বিশাল। এক ঘন্টার মধ্যেই বের করা গেল যে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন ভারতীয় অনুপ্রবেশ ঘটেনি। আমরা সেটা ডিভ ও সেনা সদরকে জানিয়ে দিলাম।

আমার অফিসে আসতে না আসতেই ক্যাপ্টেন হায়দার হাজির। সাথে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ শিকদার, ৬ ই বেংগলের কম্পনি অধিনায়ক মেজর ইসমত(প্রত্যাগত) ও ক্যাপ্টেন ইলিয়াস {জাতিয় রক্ষী বাহিনী (JRB)}. এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে শুধু মাত্র মেজর দোস্ত কে। তিনি এপারে আসতে চাচ্ছিলেন না। ক্যাপ্টেন হায়দার তাকে জোর করে বন্দুকের মুখে নিয়ে এসেছেন। মেজর দোস্ত মোহাম্মদকে ছোট্ট একটা ঘরে বন্ধ করে পাহারার ব্যাবস্থা করলাম। ততক্ষণে ৬ ই বেংগলের সবাই ফেনী নদীর প্রতিরক্ষা ছেড়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আধঘন্টার মধ্যে আরেকটি পদাতিক ব্যাটেলিয়ান এসে হাজির। তাদের থাকার জায়গা দেখিয়ে ফিরতে না ফিরতেই বিএমের অফিসে ডাক পড়লো। বিএম ও কমান্ডার দাঁড়িয়ে। বি এম আমাকে অতি নিরিহ গলায় বললেন " যে দুটো ব্যাটালিয়ান এসেছে আদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলা বারুদ নিয়ে নাও (disarm them)". আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। প্রথমতঃ তারা সবাই স্বেচ্ছায় এসেছে, দ্বিতীয়তঃ একজন সৈনিকের কাছে অস্ত্র সমর্পন আর একজন মেয়ের সম্ভ্রমহানী সমার্থক, তৃতীয়তঃ এই অসম্ভব প্রায় কাজটি জেষ্ঠ কারো করার কথা! ব্রিগেড কমান্ডার বলে উঠলেন " দেখ, আমাদের কিছু করার নেই, আদেশ সেনাসদর থেকে ডিভ হয়ে আমার কাছে এসেছে (Look young man, the order has come from the AHQ through Div, I'm undone)."

কিছু বলে কোন লাভ হবেনা বুঝে আমি হাঁটা দিলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম কিভাবে এ অসাধ্য সাধন করা যায়। ওদের ছাঊনি পর্যন্ত পৌঁছুতে পৌছুতে একটা বুদ্ধি বের হ'ল। আমি দুই ব্যাটালিয়ানের দুই সুবেদার মেজরকে (সৈনিকদের সবচেয়ে ঊঁচু পদবীর)ডাকলাম। বললাম যে চিটাগাং থেকে যারা আসছে তাদেরকে জিয়া হত্যাকারী হিসেবেই সাধারন মানুষেরা মনে করছে (কথাটা অসত্য ছিল না)। জেনারেল জিয়ার যে পরিমান জনপ্রিয়তা, যে কোন সময়, সাধারন মানুষ তাদের ওপর চড়াও হতে পারে। হাতে আস্ত্র থাকলে অযথা রক্তপাত হবে। তাই তারা দুজন যেন ব্যাপারটা বুঝিয়ে সবাইকে বলে এবং একজায়গায় অস্ত্র জমা করে।

আমি যেভাবে আমার বি এমের দিকে তাকিয়ে ছিলাম ঠিক সেই দৃষ্টিতে ওরা দু'জন তাকালো আমার দিকে। আমার তখন যা বয়স, তাদের দুজনেরই সেনাবাহিনীর চাকুরী তার চেয়ে বেশী। আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম যে আধ ঘন্টা পর আমি আমার লোকজন নিয়ে আসবো ।

২৫ মিনিটের মাথায় তারা দুজন ফিরে এসে জানালো অস্ত্র ও গোলা বারুদ আমি নিয়ে যেতে পারি।

ক্যাপ্টেন হায়দারের একক সিদ্ধান্তের ফলে ৬ ই বেংগল শুভপুরের প্রতিরক্ষা ত্যাগ করায় চিটাগাং এর সৈন্যদের কুমিল্লার দিকে আসতে আর কোন বাঁধা থাকলো না। শুরু হ'ল বানের পানির মত ২৪ পদাতিক ডিভের ও চট্টগ্রাম এরিয়ার সৈনিক ও অফিসারদের আসা।

তাদের স্থান সংকুলানের জায়গা খোঁজার জন্যে আমি বের হ'লাম, সাথে ক্যাপ্টেন হায়দার। কিছুক্ষণ পর ক্যাপ্টেন হায়দার বললেন " এই আমার স্টেনটা দেখেছ?" জীপ থামিয়ে আমরা দুজনই AK 47 এর চায়নিজ ভার্সানটি (SMG) খুঁজতে লাগলাম। কোথাও নেই!

আমাদের তখনকার জিওসি (General Officer Commanding; Division Commander) মেজরে জেনারেল আব্দুস সামাদ (প্রত্যাগত) হঠাৎ উদয় হলেন। খোঁজায় ব্যাস্ত থাকায় আমরা আগ থাকতে দেখিনি।
সটান দঁড়িয়ে স্যালুট দিলাম।" কি খুঁজছ তোমরা?" সেনা বাহিনীতে অস্ত্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ হারানোই কবিরা গুনাহ, আস্ত একটা অস্ত্র হারানোর কথা কেঊ কল্পনাও করতে পারেনা। কিছুক্ষন ইতস্তত করে ক্যাপ্টেন হায়দার বলে উঠলেন " স্যার, আমি আমার স্টেন হারিয়েছি"
"স্টেন হারিয়েছে তো কি হয়েছে বাবা?" জেনারেলের উত্তর। অত সহজে পার পেয়ে আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম দু'জন।আসলে ক্যাপ্টেন হায়দার সেনাবাহিনীর জন্যে কি বিরাট একটা কাজ করে ফেলেছিলেন তা তিনি তখনো বুঝে উঠতে পারেন নি। আর পরেও(আজ পর্যন্ত) তাঁর সেই অবদানের মৌখিক স্বীকৃতিও কেউই দেয়নি। আর শ্বেত প্ত্রের সে মিথ্যাচারের কথা আর নাই বললাম। সারা জীবনে যত মিথ্যে শুনেছি সব এক করলেও শ্বেত পত্রের একটি পাতার মিথ্যে গুলোর সমান হবেনা।

বিকেলের একটু আগে ডেরায় ফিরলাম। আরেক আপদ। চিটাগাং এর সৈন্যরা যে সংখ্যক অস্ত্র জমা দিয়েছে সেগুলোর একটা ব্যাবস্থা করতে পারলেও রাইফেল, SMG (Sub Machine Gun, sten), LMG (Light Machine Gun), MG (Machine Gun) এর গুলি গোনা আর সম্ভব হচ্ছিল না। জনা পঞ্চাশ সৈনিক কয়েক ঘন্টা টানা গুনেও শেষ করতে পারছিল না। শেষে আমি একটা বুদ্ধি বের করলাম। বাজার থেকে দাড়ি পাল্লা ও পাঁচ কে জির বাটখারা কিনে এনে পাঁচ কেজি গুলি মাপলাম তারপর সে গুলি গুনালাম। তারপর পাঁচ কেজি হিসেবে মেপে মেপে গুলি গণনা শেষ করালাম।

রুমে যেতে যেতে দেখি ব্রিগেডের ডিকিঊ ( DAA&QMG: Deputy Assistant Adjutant & Quarter Master General) মেজর এমদাদ হন্তদন্ত হয়ে আসছেন। লোকের রাতের (সন্ধ্যার) খাবার জোগাড় তখন হয় নি। কুমিল্লার সাপ্লায়ারেরা অপারগতা প্রকাশ করেছে। বুঝতে পারলাম ১ ব্রিগেড মাইনাসের খাবার প্রায় দুই ডিভিশন সৈন্যের সাথে ভাগাভাগি করে খেতে হবে। সমস্যার সমাধান অচিরেই হয়ে গেল। চিটাগাং থেকে SSD (Station Supply Depot) সেদিনের পুরো তাজা রসদ নিয়ে শুভপুর পার হয়েছে। অনেক সৈন্যই সেদিন আধখান করে ইলিশ মাছ খেল।

সন্ধারগে আগেই সবাইকে রাতের খাবার খাইয়ে দেয়া হয়েছে। আমি আমার রুমে বসে ভাবছি বুট জোড়া বদলে নেবো কিনা, এমন সময় RP (Regimental Police) এসে জানালো চিটাগাং থেকে কিছু অফিসার এসেছেন, আমার সাথে দেখা করতে চান। আমি আবাক হলাম। চিটাগাং এর সব অফিসারই তো তাদের নিজ নিজ সৈন্য দলের সাথে এসেছে , আসছে। রুম থেকে বের হয়ে দেখি-আমার প্রাণ প্রিয় বন্ধু, কোর্সমেট লে. রফিক, আরেক বন্ধু মেজবাহ উদ্দিন সেরনিয়াবাত, সেকেন্ড লে. মোসলেহ ঊদ্দিন আহমেদ, আরো ক'জন। যশোরে একসাথে কমিশন পেয়ে পাশাপাশি ইঊনিটে, একই ব্রিগেডে যোগ দিয়েছিলাম আমি আর রফিক। তার সাথে যশোরের অভিজ্ঞতা লিখতে আমার হাজার দেড়েক পৃষ্ঠার প্রয়োজন, একজন আরেকজনের জন্যে দুপুরের খাবার নিয়ে অপেক্ষা করা, ক্যাপ্টেন বেলালের (পরে ব্রিগেডিয়ার ও অবসরপ্রাপ্ত) বাসার খিড়কি দুয়ার দিয়ে ঢুকে তার স্ত্রীর সমস্ত রান্না চুরি করে এনে সাবার করা, সব সময় একই কাপড় পরে সারা যশোর চষে বেড়ানো- দড়াটানার মোড়, সিদ্দিক বেকারি, কারবালা, ঘোপ সেন্ট্রাল রোড, বন্দুক আলার বাড়ি, চুড়োমোন কাঠি, শার্শা, বারোবাজার, গাজী কালুর মাজার, চৌগাছায় স্বাধীনতা যুদ্ধের নিদর্শন দেখতে যাওয়া, শনিবার রাতে রিকশাওয়ালাকে সিটে বসিয়ে দুজনে পালা করে রিকশা চালানো, সারারাত প্রচন্ড গরমে (১১০ ডিগ্রি ফারেন হাইট) বাসস্থানের সামনের রাস্তায় শুয়ে শুয়ে পুরো volume এ গান শোনা-ABBA, Beatles, Bee gees.......... হঠাৎ মাথা থেকে পা পর্যন্ত শীতল স্রোত বয়ে গেল। এদের কথাই কি বিচারপতি সাত্তার বলছিলেন "।.।।...।।...।একদল দূষ্কৃতকারী...... "? আমি পাথরের মত দাড়িঁয়ে থাকলাম।

'''দোস্ত, কিছু খাবার দে, দু'দিন ধরে না খাওয়া"। সম্বিত ফিরে পেয়ে আমি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদারকে তলব করলাম। ব্রিগেড ট্যাক হেড কোয়ার্টারে আমি একা অফিসার। আমার সেনাদলের অফিসার্স মেস তখন ফেনী নদীর আশেপাশে। ব্রিগেড অফিসার'স মেস কোথায় জানিনা। আমি সৈনিকদের সাথেই খাই। কোয়ার্টার মাস্টারকে ওদের খাবারের যোগার করতে বলতেই সে যেন কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বল্লো " স্যার, আমাদের খাওয়া দাওয়া তো শেষ , যা কিছু ছিল ফেলে দিয়েছি"। আমি ওর সাথে খাবার ফেলার জায়গটাতে গেলাম। একটা গর্তে কিছু ভাত, ডাল, সব্জি আর মাছ। আমি খাবার গুলো তুলে ধুয়ে নিয়ে আসতে বললাম। এক হাতে একটা বাল্টি আরেক হাতে ক'টা প্লেট নিয়ে কোয়ার্টার মাস্টার আসতে না আসতেই সবাই বালতির মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়লো।

আমার ১৯৭৪ এর কথা মনে পরে গেল।

মোটা লম্বা বালাম খাতায় সবার নাম চড়ালাম। তারিখ ও সময় দিলাম। সাক্ষর নিলাম। আমি সাক্ষর করলাম। আবার তারিখ ও সময় দিলাম। আত্মসমর্পনের অফিসিয়াল রেজিষ্টার ওটা। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। ওরা সাধারন ক্ষমার সময় সীমার প্রায় ১২ঘন্টা আগে সারেন্ডার করেছে।

অন্যদেরকে আরেকটা রুমে জায়গা করে দিয়ে রফিককে আমার রুমে নিয়ে আসলাম। আমার একপ্রস্থ কাপর পরে আমার পাশেই সে শুলো। ক্যাসেটটা ছেড়ে দিয়ে গল্প করতে লাগলাম।

রাত বারোটা। আমার ঘরে টোকা পড়লো। আসতে পারি? মোসলেহ ঢুকলো। স্যার দু রাত ঘুমুতে না পেরেও ঘুম আসছে না। চোখ বন্ধ ক্রলেই দেখতে পাচ্ছি সে বিভৎস দৃশ্য। আমি জেনারেল জিয়া হত্যার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী।

ক্যাসেটে বেজে চলছেঃ

No more carefree laughter
Silence ever after
Walking through an empty house, tears in my eyes
Here is where the story ends, this is goodbye

Knowing me, knowing you
There is nothing we can do
Knowing me, knowing you
We just have to face it, this time we're through

Breaking up is never easy, I know but I have to go

Knowing me, knowing you
It's the best I can.।.।.।.।.।.।

 চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহ-৪

বংগবন্ধুর গভীর স্নেহময় দৃষ্টি যিনি দেখেছেন তিনি জানেন জিয়াউর রহমানকে কেমন স্নেহ করতেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামল যার দেখা তিনি জানেন বংগবন্ধুর সম্মান তিনি কখোনই ধুলায় মেশান নি।

১ লা জুন, ১৯৮১।

আমি আর রফিক যে বিষয়টি সচেতনে এড়িয়ে গেছি এ ক' ঘন্টা, মোসলেহ সে বিষয়টিরই অবতারনা করলো। আমি হতভম্ভের শুনে গেলাম। মোসলেহ শেষ করার অনেকক্ষণ পর আমি বোঝার চেষ্টা করলাম কি হয়েছিল সে রাতে।

জেনারেল জিয়াকে সার্কিট হাউজ থেকে EBRC (East Bengal Regimental Centre) এ নিয়ে আসার জন্যে অফিসাররা সার্কিট হাউজ ঘেড়াও করে। কিছু গুলি বিনিময়ের পরে যাদের দায়িত্ব ছিল ভেতরে ঢোকার তাদের সবাইকে একটা করে কক্ষ বরাদ্দ করা হয়েছিল clear করার জন্যে। মোসলেহকে যেটা বরাদ্দ করা হয় সেটাতে জেনারেল জিয়ার থাকার কথা ছিল না। মোসলেহ দরোজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে দরোজা খুলে যায়। সাদা ধপধপে পাজামা পাঞ্জাবী পরা জেনারেল জিয়া বেরিয়ে আসেন। তাঁকে দেখে মোসলেহ ঘাবরে যায়। "কি ব্যাপার" তিনি জিজ্ঞেস করলে মোসলেহ বলা শুরু করে " স্যার আপনাকে আমরা...... এটুকু বলতেই প্রচন্ড জোরে ওর কাঁধে পেছন থেকে কেউ ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় মোসলেহ মাটিতে পড়ে যায়। মাটি থেকে উঠতে উঠতে সে দেখতে পায় যে তাকে যে ধাক্কা দিয়েছিল সে জিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে স্টেনের {SMG, 7.62 mm, type 56, Origin China (carbon copy of AK 47)} তিরিশটি গুলি ট্রিগারের এক চাপে, ওপর থেকে নীচে স্প্রে করে। গুলির ধাক্কায় জেনারেল জিয়ার দেহ পেছনে হটে যায়, তারপর মাটিতে আছড়ে পড়ে। হত্যাকারী ঘুরতেই মোসলেহ চিনতে পারে তাকে- লে. কর্নেল মতি {G-I, CI (General Staff Officer, Grade One, Counter Insurgency)}.পুরো হত্যাকান্ডটি ঘটতে ১ মিনিটের ও কম সময় লাগে। কর্নেল মতি দ্রুত পায়ে স্থান ত্যাগ করে।

বেশ কিছুক্ষণ হয় মোসলেহ চলে গেছে। আমি ঝিম মেরে পড়ে আছি।
"দোস্ত আমাদেরকে ওরা ঝুলিয়ে দেবে"।

"ওরা তোকে ঝুলিয়ে দেবে কেন? তুই প্রায় বারো ঘন্টার মত আগে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিস। আমি in writing তোর কাছ থেকে আত্মসমর্পণএর ব্যাপারটি নিয়েছি।It's sealed and signed- তোর কোন ভয় নেই। তোর কোন রকম বিচারই হবেনা।

আবার নিস্তব্ধতা।

"দোস্ত, তুই একদিন আমার রুমে আমার হাত দেখে বলেছিলি যে আমি ২৫ বছরের বেশী বাঁচবো না। আমি আবার কাঠ হয়ে গেলাম।"

ক্লাস টুতে পড়তে নানার সার সার বইয়ের আলমারিতে একটা বই আবিষ্কার করি "Chiro's Book of Numbers". Numerology (সংখ্যা তত্ব)র ওপর ঝোঁক হয় , নানা মারা যান, আমি তারঁ বইয়ের ভেতর থেকে কিরোর বইগুলো নেই। Palmistry তে হাতে খড়ি হ'ল। তখন বিভিন্ন হাতের ছবি দেখাটাই ছিল মূখ্য। বড় হ'তে হ'তে প্রধান তিন লাইন (Life, Head , Heart ) শেষ করে অপ্রধান লাইন (sun, health, fate)বিভিন্ন চিহ্ন (star, flag, island etc.) শিখতে শিখতে কেমন যেন নেশায় পেয়ে বসে আমাকে। মানুষের হাত যদিও খুবই কম দেখেছি। সব মিলিয়ে হয়তো বা সাকুল্যে দশ বারোটি।

দূর্ভাগ্যক্রমে আমার দেখা হাতের মধ্যে একটা ছিল রফিকের। কোন এক শনিবার রাতে ফান করতে করতে তার হাত দেখি । লাইফ লাইন সাধারন অন্য লাইফ লাইনের চার ভাগের একভাগে এসে বেশ কতগুলো আইল্যান্ড, তারপরই শেষ। এরকম হাত আমি কি্রোর কোন বইতে দেখিনি। নিজে নিজে এটার একটা অর্থ বের করতে চেষ্টা করছিলাম। অনেকক্ষণ আমাকে চুপ থাকতে দেখে রফিক বললো "দোস্ত কি দেখছিস?" শুধু মাত্র মজা করার জন্যে (আমি ওর হাতটা বুঝিনি) বললাম "তুই তো ২৫ বছরেই পটল তুলবি। তোর একটা মাত্র গার্ল ফ্রেন্ড তাও কত দূরে। যশোরে তাড়াতাড়ি কতগুলো বানা। সময় নেই।"
"নারে দোস্ত, একটাই সামলানো আমার জন্যে বিরাট ব্যাপার।"

আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম অনেক্ষণ, ও চুপ মেরে গেল।

গান শুনছি। রফিক গুন গুন করা শুরু করছে গানের সাথে। রাত চারটার সময় রুমের ফিল্ড টেলিফোন ক্রিং ক্রিং। বি এম ও প্রান্তে। "শোন তুমি তোমার সেনাদলে ফেরত যাও। ২৪ ডিভের বেশীর ভাগই সারেন্ডার করেছে। তোমার অধিনায়কের সাথে এক্ষুনি যোগাযোগ কর।" রানারকে পাঠালাম গাড়ী আনতে। ওয়্যারলেসে অধিনায়কের সাথে যোগাযোগ করতেই আমাকে তিনি আদেশ দিলেন আমার উপদল নিয়ে আমি যেন এক্ষুণি চিটাগাং রওয়ানা হই। চিটাগাং রেডিও স্টেশনের সৈনিকেরা এখনো Surrender করেনি। আমি যেন পরদিন সকাল ১১টার মধ্যে রেডিও স্টেশনের দখল নেই।

রফিকের সাথে বিদায়ের পালা। দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেকক্ষণ পর আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে কিছু না বলে ঊল্টো ঘুরে দরোজা দিয়ে বের হলাম :
............
Now I understand what you tried to say to me,
How you suffered for your sanity,
How you tried to set them free.
They would not listen, they did not know how.
Perhaps they'll listen now.
.............................................................................
.................For they could not love you,
But still your love was true.
And when no hope was left in sight
On that starry, starry night,
You took your life, as lovers often do.
But I could have told you, Vincent,
This world was never meant for one
As beautiful as you.



চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহ-5
যারা ইতিহাসের বিভিন্ন পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টায় সচেষ্ট আমি তাদেরকে এই পর্বটি মনোযোগের সাথে পড়ার জন্যে অনুরোধ করছি।

যারা বংবন্ধুকে এবং জেনারেল জিয়াকে নিয়ে ঘৃণার চাষ করে থাকেন, যাদের যাপিত জীবন ঘৃনার সাথে বসবাসের জীবন তাদেরকে এই পর্বে আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রসুত অনুধাবন থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্যে করজোরে অনুরোধ করবো ।

তবে,কেবলমাত্র বুদ্ধিমানেরাই নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে থাকে।
আমার মতন সাধারন মানুষ শিক্ষা নেয় নিজের ভুল থেকে।

আর যারা IDIOT তারা কখনই কোনো শিক্ষা নেয় না।
সকাল চারটার পর থেকে, ১ লা জুন, ১৯৮১।দরোজা দিয়ে বের হয়ে আসতেই দু'পাশ থেকে খটাস খটাস, স্টেনের ওপড় হাতের তালুর বাড়ির শব্দ। চমকে উঠলাম। দু'জন এম পি (Military Police) আমাকে অভিবাদন জানালো। -তোমরা? এখানে? আমার রুমের সামনে? তোমাদের ডিউটি কোথায়?-স্যার, এখানেই।-এখানে? মানে? কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে ওদের কজন তোতলাতে তোতলাতে বল্লঃ বি এম স্যার তিন নয় (3x9, 3 guard commanders 9 guards in 24 hours, each group for 8 hours)সান্ত্রী লাগিয়েছেন আপনার রুমে আর চিটাগাং থেকে আসা স্যারদের ঐ রুমে।এই প্রথম আমি চিন্তিত হ'লাম রফিককে নিয়ে। গাড়িতে উঠে বিএম এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম, পেলাম না। কমান্ডারের সাথে প্রথমে VHFএ না পেয়ে পরে HF সেটে কথা বললাম। আমাকে উনি বললেন চিটাগাং থেকে আসা অফিসারদের নিরাপত্তার জন্যেই গার্ডের ব্যাবস্থা উনি নিজেই করেছেন।মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম আমি চেইন অফ কমান্ডে বিশ্বাস হারালাম। বাঘের খাঁচায় যে রফিকরা সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ঢুকেছে আর আমিও তাদের রেখে এসেছি সেখানে, তখুনি তা বুঝতে শুরু করলাম। আমার কমান্ডারকে আমি যদি বিশ্বাস করতে পারতাম! সত্যি কথাটা বলতে তাঁর কি অসুবিধে ছিল?আসসালাতু খাইরুম মিনান্নাওম। বাজে সকাল সাড়ে চারটা। সামনে আমি আমার জীপে, আমার পেছনে সাতটা গাড়ি, সবার পেছনেরটায় আমাদের রসদ আর cook house. মাঝখানের গাড়িগুলোয় যুদ্ধের সরঞ্জাম। মনটাকে অন্য কোনখানে নিয়ে যাবার জন্যে মনে মনে আমি হিসেব করা শুরু করলাম কত গুলো কামানের গোলা, কত সংখ্যক গুলি আর কয়টা জীবন লাগতে পারে চিটাগাং রেডিও স্টেশন দখল করতে। অনেকক্ষন ধরে বসে আছি জ্যামে। চিটাগাং থেকে বহরের পর বহর সৈন্যদল আসছে। তারাই এই সাত সকালে চিটাগাং এর রাস্তায় জ্যাম লাগিয়েছে। অধিনায়কের সাথে যোগাযোগ করলাম সকাল সাতটায়। জানিয়ে দিলাম যে আমাকে যদি MP Escort না দেয়া হয় রাস্তা ক্লিয়ার করতে আর আধ ঘন্টার মধ্যে, তা'লে আমি ১১টার মধ্যে রেডিও স্টেশনে পৌছুতে পারবো না। উনি বল্লেন যে খুব তাড়াতাড়ি একটা ব্যাবস্থা করছেন তিনি।হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠলো, মার্চ ১৯৭১।চিটাগাং রেডিও স্টেশন। পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস, আমার প্রিয় ফুপাতো বোনটা গাইছেঃ "তোমার এই খেলাঘরে/ শিশুকাল কাটিলো রে/তোমার এই ধুলামাটি/ অংগে মাখি / ধন্য জীবন মানি.........আমার তখন বারো, ওর এগারো, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি ..।.।...তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম আমার নিজের স্বাধীন দেশের সেনা বাহিনীতে আমরা বিভাজিত হয়ে মরণ খেলায় মাতবো? যেখান থেকে আমার বোনটি না জেনে তার স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে দাড়াঁনো দেশটির জাতীয় সংগীত গাইলো, সেটাকেই উড়িয়ে দিতে যাচ্ছি আমি, শত্রু মুক্ত করতে নয় সহযোদ্ধা মুক্ত করতে। ৩০ লক্ষ বলী, আড়াই লক্ষ সম্ভ্রম,১ কোটি বাধ্য অভিবাসন, ৬০ হাজার যুদ্ধ শিশু, চিকিৎসা আওতা বহির্ভুত অগোচর অগনিত গর্ভপাত, আশ্রয় শিবিরে অগনিত অসহায় শিশু আর বৃদ্ধের কলেরায় মৃত্যু বীরের এ রক্ত স্রোত, মাতার.।.।।.....।.।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।...।।কিছু শকুনের খাদ্য যোগানোর জন্যেই...যে MP Escort আমাদের রাস্তা ক্লিয়ার করে নিয়ে যাবে তাদেরকে আমাদের ফ্রিকয়েন্সী দেয়াছিল। তারা যোগাযোগ করলো ও যে তারাও আমাদের মাইল টাক পেছনে জ্যামে আটকে গেছে...। শর্শের মধ্যে ভুত! সাড়ে দশটার সময় আমি আমার প্রাক্তন বিএমএ কমাডান্ট ব্রিগেডিয়ার লতিফকে চিটাগাং থেকে আসতে দেখে জীপ থেকে নামলাম। কুশলাদী জিজ্ঞেস করলাম (নিয়ম অনুযায়ী তাঁরই আমাকে জিজ্ঞেস করার কথা।কিন্ত আমি বিজয়ী পক্ষের উনি বিজেতা)। Nuremberg Trial এর সেই বিখ্যাত ঊক্তিটি মনে পড়ে গেল- Yes! Our greatest crime is that we lost the war! কে যেন কাকে বলছিল বিচারের সময়। ২৪ পদাতিক ডিভিশনের একমাত্র কমান্ডার যিনি বেঁচে গিয়েছিলেন সে সময় তিনি হলেন এই লতিফ। বাকী তিন ব্রিগেড কমান্ডার ( এক বীর বিক্রম ও এক বীর প্রতীক সহ)কে ফাঁসীতে ঝুলতে হয়। চার কমান্ডারের মধ্যে শুধু লতিফই যে ছিলেন পাকিস্তান প্রত্যাগত। বাকিরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা।আনুমানিক দশটার দিকে অধিনায়ক যোগাযোগ করলেন আবার। চিটাগাং রেডিও স্টেশন আত্ম সমর্পন করেছে। আমার আর চিটাগাং যাবার দরকার নেই। পরবর্তী আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা তখন যেখানে, সেখানেই যেন অবস্থান করি। আমরা তখন জোড়ালগঞ্জে।আমার জীপটা সেখানে থেমেছে, তার বাঁ পাশেই একটা সমতল খালি জায়গা। আতি পুরনো কিছু গাছ, ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত। তার পর শ'খানেক বছরের পুরোনো একটা মসজিদ। গাড়ি থেকেই জায়গাটা পছন্দ হয়ে গেল। নেমে হাবিলদার মেজরকে নিয়ে রেকী (reconnaissance) করলাম দ্রুত। মিনিট বিশেকের মধ্যে সব তাঁবু দাঁড়িয়ে গেল। হঠাৎ চারিদিকে আলো বেশ কিছুটা কমে যাওয়ায় আমি চারিপাশ লক্ষ করলাম।আমাদের ক্যাম্প ঘিরে শয়ে শয়ে লোক এবং প্রতি মূহুর্তে বাড়ছে। সে সময় পর্যন্ত আমার কোন ধারনাই ছিল না জিয়া কতটা জনপ্রিয়। তিন বছরের কিছু কম সময়ে দেখেছি যে জিয়া নিজে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে মুক্তিযুদ্ধ বি্রোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। তখন অফিসার ছিল চার কিসিমেরঃ১। মুক্তিযোদ্ধা।২। পাকি-প্রত্যাগত-সংখ্যায় সবচেয়ে বেশী যাদের মধ্যে ১০০+ অফিসারের সকল সুযগ থাকা সত্যেও মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয় নি। এমন কি কেউ কেউ পাকিদের দখলদার আর্মির অফিসার হয়ে ১৯৭১ এ মুক্তি যুদ্ধের সময় বাংগালীদের ওপর চরম অত্যাচার চালিয়েছে। যেম্ন মেজর জেনারেল আমজাদ, প্রাণ ও RFL এর মালিক। প্রত্যন্ত গ্রামের এক ক্ষমতাহীন অনুগ্রহ জীবীর ফাঁসি হয় একাত্তরে নির্যাতন, হত্যা, নারী সম্ভ্রম হরন, অগ্নি সংযগে শুধুমাত্র টাকা আর আত্মিয়তার জোরে সেই অনুগ্রহজীবির তুলনায় হাজার গুণে দোষী মানুষ পার পেয়ে যায়।টাকা কি দ্বিতীয় ইশ্বর না ইশ্বর?৩।7th Fleet (JRB officerদের সাতটি কোর্সের "লিডার"দের "অফিসারের মর্যাদা " দিয়ে সেনা বাহিনীতে আত্মীকরন করা হয়)। ৪। আমরা-বাংলাদেশী কমিশনড আফিসার। ১, ৩ ও ৪ ক্রমিকের অফিসারেরা ছিল মোটামূটি একদল। প্রত্যাগতরা আরেক। জিয়ার ওপর আমাদের ছিল চাপা অসন্তোষ। আমরা মনে করতাম যে ২ ক্রমিকের অফিসারেরা জিয়ার প্রতি খুবই সন্তষ্ট। আমার সেনা উপদলের চারপাশে এত মানুষ জড়ো হ'ল যে আমি চিন্তিত হয়ে পরলাম ।পুরো জোড়াল গঞ্জ ভেংগে পড়েছে। করের হাট ও অন্যান্য জায়গা থেকে লোকজন আসছেই। আমি একটা গাছের ডালে চড়ে ওদের তীক্ষভাবে লক্ষ করতে থাকলাম। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিন চার জন নেতা গোছের লোককে চিহ্নিত করে RP (Regimental Police) হাবিলদারকে তাদের ডেকে আনতে পাঠালাম। একজন এলাকার চেয়ারম্যান, আরেকজন স্কুলের হেড মাস্টার, একজন প্রাক্তন চেয়ারম্যান, দুজন মেম্বার। কেঊই বিএনপি বা এর অংগ সংগঠনের নয়। তারা লমা সালাম দিল "স্লঅঅঅঅমালাইমুম সার"। সালাম দিয়ে প্রথমেই আমাদের অনেক প্রশংসা করলো। তারা ধরে নিয়েছে যে চিটাগাং থেকে যারা ঢাকার দিকে যাচ্ছে তারা জিয়াকে মেরেছে আর যারা ঢাকার দিক থেকে চিটাগাং যাচ্ছে তারা জিয়ার সমর্থক। একটু পড়েই তারা আমদের অনুরোধ করা শুরু করলো যে তারা আমাদের তাঁবু গাড়তে দেখেই একটা গরু ও দুটো খাসী জবাই করেছে আমাদের জন্যে। দুপুরের আতিথ্য যেন আমরা গ্রহন করি। যতই আমি বোঝাতে চাই যে সে আতিথ্য নেয়া নিয়ম বহির্ভুত , ততই তারা পীড়াপীড়ি আর অনুনয় বিনয় করতে থাকে। ঘন্টা খানেক চেষ্টা করে তাদের সাথে পেরে না ঊঠে আমি বলে ঊঠলাম যে আমরা যে কোন সময় সে স্থান ত্যাগ করতে পারি। তাদের উত্তর -আমরা যেখানে যাব সেখানেই তারা খাবার পৌছে দেবে। ঊপায়ান্তর না দেখে আমি আমার অধিনায়কে সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করলাম। তারপর সহ অধিনায়ককে। তাদের সাথে আমার কমিঊনিকেশন নেট ওঅর্ক VHF এ। রেঞ্জ, ক্ষেত্র ভেদে ৫ থকে ৮ মাইল মাত্র। যোগাযোগ হ'ল না। মহাসড়ক ধরে তখন একটা সিগন্যাল দলকে ঢাকার দিকে যেতে দেখে থামালাম। একজন হাবিলদারকে আদেশ করলাম তক্ষুণি তাদের HF সেট দিয়ে ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের সাথে আমাকে যোগাযোগ করিয়ে দিতে। সে হাবিলদারের কোন কারনই ছিল না আমার আদেশ মানার। সে আমার under command নয়। কিন্তু বিজেতার সে মনোবল ছিলনা। মাত্র ১০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তার অধিনায়কের অনুমতি নেয়ার কোন চেষ্টাও সে করলো না। পাঁচ মিনিটে সংযোগ স্থাপন হ'ল। কমানডারকে পেলাম না। তিনি তখন একসাথে ডিভ সদর ও সেনা সদরের সাথে কথা বলছেন। অগত্যা বি এমের সাথে যোগাযোগ করলাম। বি এম বললেনঃ " You goof, why don't you understand that this is their expression of love for General Zia! Accept their invitation humbly. This is a different time and you are in a different world!" (হাঁদারাম, বুঝছনা কেন এটা জেনারেল জিয়ার প্রতি ওদের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। বিনীতভাবে ওদের আতিথ্য গ্রহন কর । এটা ভিন্ন সময় ও তুমি এখন ভিন্ন জগতে)।চেয়ারম্যান সাহেবকে বিনীত ভাবে বললাম যে আমরা তাঁর আতিথ্য গ্রহন করছি। জনতার মধ্যে হুল্লোর পরে গেল। দুপুরের খাবার না বানাতে আদেশ দিয়ে মসজিদটার কাছে এলাম একা। নির্জন। দিঘিতে টলটলে জল। মনে আসলো যে ২৯ তারিখ সকালে পিটির পর আর গোসল করিনি। ৩০ তারিখের চড়ানো পোশাক গায়ে থেকে নামাই নি। দৌড়ে এসে টেন্টে কাপড় ছেড়ে সর্টস পড়ে দিঘিতে ঝাপিয়ে পড়লাম। অনেকক্ষন ডুব সাঁতার দিয়ে যখন আমি পানি ছেড়ে উঠলাম, ততক্ষনে আংগুলের চামড়া কুঁচকে গেছে আর ক্ষিদায় পেট চোঁ চোঁ করছে।কাছেই একটি স্কুলের মাঠে এলাহী কান্ড। গরুর ও খাসীর মাংসের সাথে পোলাও, বিভিন্ন সাইজের মুরগীর রোষ্ট, কলিজা, গুরদা এসব দিয়ে একটা পদ, মুরগীর লটপটি আরও হরেক রকমের খাবার। ১৫/২০টা টেবিল এক সাথে করে সব সাজানো হয়েছে। তিল ধারনের স্থান নেই। চেয়ারম্যান একটু কুন্ঠিত হয়ে বললেন অনেক গ্রামবাসী তাদের বাড়ি থেকে ভালবেসে আমাদের জন্যে খাবার নিয়ে এসেছে, তাই এত হযবরল।খাচ্ছি আর মনে করছি -যে মানুষটিকে এতদিন প্রতিপক্ষ জেনে এসেছি সে মানুষটির প্রাপ্য ভালবাসা উজাড় করে আমাকে দেয়া হচ্ছে! কী বিচিত্রই না এ জীবন। কি অদ্ভুতই না এর ঘটনা প্রবাহ।

চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহ-৬

স্থানঃ শিল্প ভবন। মতিঝিল বানিজ্যিক এলাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মান সংস্থার চেয়ারম্যানের অফিস কক্ষ।কালঃ বংগবন্ধু হত্যার কিছু কাল পর।পাত্রঃ চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মান সংস্থাটেলিফোন বেজে উঠলো। পিএ ওপাশ থেকে বললেন, স্যার কেনটনমেন্ট থেকে ফোন এসেছে, আপনার সাথে কথা বলতে চায়।

Cantonment : Mr. Chairman... we heard that you are yet to remove the portrait of Mujib from your office. Is it true?

Chairman: Who are you?Cantonment: I'm from the Army Headquarters.Chairman: I don't take orders from killers!

চেয়ারম্যান চাকুরিচ্যুত হলেন।

নভেম্বরের শেষ দিকে, ১৯৭৫নারায়নগঞ্জ সোনাকান্দার শ' খানেক বছরের পুরোনো একটি নীলকুঠি যা তার জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছিল আবাসন হিসেবে সেখানে সেই চাকুরিচ্যুত চেয়ারম্যান বসা, চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। একটু আগেই তিনি বেহরুজ ইসপাহানীকে পথ দেখিয়েছেন এই বলে "Mr. Ispahani, thank you very much for your offer. Unfortunately, I can't accept it. I can serve a purpose not a person." বেহরুজ তাকে ইসপাহানীদের ফিরে পাওয়া সমস্ত কলকারখানার CEO হবার অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন ছয় অংকের মাসোহারা সহ।এদিকে বাড়িতে সেদিন খাওয়া হয়েছে সন্তানের স্কলারশীপের টাকা দিয়ে। পরদিন থেকে উপোস থাকতে হবে।

এমন সময় একটা ফোন আসলো । আবার ঐ কেনটনমেন্ট থেকেই। মেজর জেনারেল জিয়া কথা বলবেন।

জিয়াঃ আমি দূঃখিত এবং ক্ষমা প্রার্থী যে আপনার ওপর জুলুম করা হয়েছে। আপনার কি সময় হবে কাল আমার সাথে এক কাপ চা খাওয়ার?চাকুরীচ্যুতঃ স্যার আপনাদের কেনটনমেন্টের সৈনিকেরা বেজায় বেয়াদপ। ওরা সম্মান করা শেখেনি।

জিয়াঃ আমার এডিসি আপনাকে থার্ড গেইট থেকে নিয়ে আসবে।

পরদিন যখন সেনা সদরে চাকুরীচ্যুতের গাড়িটি ঢুকে জেনারেল জিয়ার অফিসের সামনে থামে জেনারেল জিয়া রাস্তা থেকে ঐ চাকুরীচ্যুতকে রিসিভ করে অফিসের ভেতরে নিয়ে যান এবং তাকে অনুরোধ করেন যাতে করে তিনি আপাতত প্ল্যানিং কমিশনের ইন্ডাসট্রিজ ডিভিশনের দ্বায়িত্ব নেন এবং খুব শীগগীরই তাকে তার প্রাপ্য সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত করা হবে।আলাপচারিতের শেষে জিয়া তাকে অনুরোধ করেন দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে।মেনু ছিল, ভাত, ঢেড়স ভাজি আর ডাল।

দেড় মাস পর জিয়া তাকে BCIC র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের নিয়োগ দেন।

দুর্বিনীত জিয়ার কাছ থেকে বিনয় শিখুন যারা তাকে ভালবেসে থাকেন বলে দাবীকরেন।এই আত্ম গর্বে গর্বিত জালিম থেকে শিখুন ক্ষমা চাইলে কেউই ছোটো হয় না বরং বিশাল হয়।সৃষ্টি কর্তার একটি গুন বাচক নাম "যিনি বারে বারে ক্ষমা করেন"

আপনাদের মধ্যে যারা এখনো আছেন এই বদ্ধমূল ধারনা নিয়ে যে বংগবন্ধুকে ছোটো করলে জিয়াকে বড় করা হয় তাদের আরেক বার ভেবে দেখবার সময় এসেছে।

..অপরাহ্ন, ১ লা জুন, ১৯৮১, রেডিওর একটি ঘোষনা আমাকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। মেজর দোস্ত মোহাম্মদ সিকদার নাকি অধিনস্ত সৈন্যসহ আত্মসমর্পন করেছে! কিভাবে! দোস্ত মোহাম্মদ সিকদার তখন ৬ ই বেংগলের সহ অধিনায়ক। তারই ব্যাটালিয়ানের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন হায়দার তাকে জোর করে বন্দুকের মাথায় ধরে নিয়ে এসেছে। ফেনীর অস্থায়ী ব্রিগেড সদরে সে-ই একমাত্র বন্দী। রফিক, সেরনিয়াবাত বা ইলিয়াস নয়, সে কি করে আত্মসমর্পন করে? সেই প্রথম আমার রক্ত হীম হয়ে আসা শুরু করলো। What am I missing? কি যেন একটা কিছু আমার সামনেই যা আমি দেখতে পাচ্ছিনা। কি যেন ঘটে চলেছে যা আমি ধরতে পারছিনা। অত্যন্ত অস্বস্তিকর অনুভূতি। আমি আবার আমার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সজানোর চেষ্টা করলাম। দশ বারো বার করেও কিছুই মেলাতে পারলাম না। ধুৎতেরি বলে আমার সিটে আমার পাশে শোয়ানো ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালিয়া মনে মনে ঠিক করলাম করের হাটে পৌঁছেই ব্যাটারি কিনতে হবে গান শোনার জন্যেঃ If you change your mind, I'm the first in line Honey I'm still free Take a chance on me If you need me, let me know, gonna be around If you've got no place to go, if you're feeling down If you're all alone when the pretty birds have flown ......।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...।।...। Take a chance on me That's all I ask of you honey Take a chance on me ৭৭/৭৮ এর ওঅর্ল্ড চার্টের টপ টেন এর টপ মোস্ট গান। গান শুনতে শুনতেই হঠাৎ জিগসাও পাজলের (jigsaw puzzle)প্রত্যেকটি অংশ ঠিক ঠিক জায়গায় বসে যেতে শুরু করলোঃ জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা। ব্রিগেড কমান্ড পোস্টে সব প্রত্যাগত দেখা, রফিকও অন্যান্য আত্মসমর্পনকাকে দেয়া প্রয়োজনাতিরিক্ত পাহারা, এখন রেডিওতে শোনা দোস্ত মোহাম্মদ কাহিনী। ধীরে ধীরে বোধদয় হওয়া শুরু করলো যে যা দেখছি যা শুনছি যা বুঝছি তারো বাইরে কিছু ঘটে চলছে, আর তা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা বনাম প্রত্যাগতদের লড়াই। আর আমরা ব্যাবহৃত হচ্ছি দু'দল দিয়েই। আর যে দলকে ঠিক পছন্দ করি না সে দলেরই আমি দাবার ঘুঁটি ( a pawn- a peon- a powerless person, কে শিখিয়েছিল? আমার চতুর্থ শ্রেণীর গৃহ শিক্ষিকা Mrs. Rasmusen? না ফৌজদারহাটের মিস্টার রাফি ইমাম)? জোরাল গঞ্জ থেকে কিছুক্ষণ আগে রওয়ানা দিয়েছি করের হাটের উদ্দেশ্যে। নির্দেশ মত সমস্ত ভারী অস্ত্র, গোলা বারুদ ও কুক হাউজের ৩ টন গাড়ী রেখে এসেছি। হাতের নাগালে যত পেয়েছি ততগুলো স্টেন নিয়েছি। কমান্ডার আমাকে আমার ঊপদলকে নিয়ে করের হাটের একটা নির্দিষ্ট স্থানে ডেকেছেন। চেষ্টা করছি বুঝতে, কেন? খাবারের সংস্থান নেই (যদিও বলা হয়েছে যে যথা স্থানে যথা সময়ে খাবার পৌঁছে যাবে), ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেলে আসা, বেশী করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নেয়া, হালকা পোশাক। আমাকে কেন? ব্রিগেডে কি Subaltern (Lieutenant & Second Lieutenant) এর অভাব পরেছে? হিসাব করে দেখলাম পুরো ব্রিগেডের ১৫ জন সাবলটার্নের মধ্যে ১০ জনই উপস্থিত! প্রথমে ব্রিগেড সদরে G-III, অপস রুমে চিন্তার ঝড়ে আংশ নেয়া, আত্মসমর্পন করানো, নিরস্ত্রীকরন করানো, চিটাগাং এ রেডিও স্টেশনের দখল নিতে পাঠান, এখন আবার কি যেন কি অপারেশনে পাঠাবে। আবার অংক কষতে বসলাম। সহজেই অংক মিলে গেল। এরকম পরিস্থিতিতে, যখন ন্যায় অন্যায়ের সীমা রেখা ম্লান হয়ে যায় (when the thin line between right and wrong gets blurred) , তখন ঠিক ন্যায় নয় এমন কাজ করাতে বিস্বস্থ লোকের প্রয়োজন হয়। আমার বিস্বস্থতা আমার পড়ালেখার সাথে জড়িয়ে আছে। কমান্ডার, ব্রিগেড মেজর (বি এম)আর আমি একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের-ফৌজদারহাট কেডেট কলেজের।

ফেঁসে যাচ্ছি কি? করের হাট পৌঁছে রানারকে ব্যাটারী কিনতে বাজারে নামিয়ে দিয়ে , যতক্ষণে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছুলাম, ততক্ষণে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে হত্যা, বিপথে যাওয়া একদল সৈন্যকে বাগে আনা, দেশের তরে জীবন দেয়ার সুযোগ পেয়ে আত্মহারা হওয়া এগুলো সব উবে গেছে। বুঝে গেছি এ হচ্ছে এক দলের অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করার সুযোগের সদ্যবহার করা। প্রত্যাগত দল যদি হেরে যায় তবে আমার ভাগ্যে কি ঘটবে তা আমার কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেল। তবে আশার কথা যে সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ।দেখি আমাদের একই ব্রিগেডের অন্য সেনাদলের মেজর তালেবুল মাওলা (মেজর সাঈদ ঈস্কান্দার , খালেদা জিয়ার আপন ছোট ভাইয়ের কোর্স মেট, প্রয়াত), তাঁর উপদল নিয়ে আগেই এসে পড়েছেন। তাকেও ডেকেছেন কমান্ডার। মেজর মাওলার মোটর সাইকেলেরন ধবংস সাধন করার তিন মাস পূর্তিও হয়নি আমার, তাই তাঁকে এড়িয়ে যাবার ব্যার্থ চেষ্টা করলাম। সদা হাস্যজ্জ্বল মেজর মাওলার মুখ পান্ডুর বর্ণ ধারন করেছে। তাকে আমার চিনতেই কষ্ট হচ্ছিল। আমি পৌঁছানোর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই পৌঁছুলেন কালা ভাই (কমান্ডারকে এ নামেই ডাকা হ'ত আড়ালে), ইঊনিফর্মের সাথে স্নিকার পায়ে, গলায় মাফলার পেঁচানো। তার হাতের তাক ছিল অব্যর্থ। আমি আমার চাকুরী জীবনে তার চেয়ে ভাল চাঁদিয়াল (marksman) দেখিনি। শিকার করা ছিল তার নেশা। হাতে মোড়ান একটি quarter inch map (বিশেষ স্কেলের ম্যাপ) নিয়ে উনি তিন মিনিটের একটি ব্রিফিং দিয়ে আমাদের দুজনকে ছেড়ে দিলেন। করের হাট থেকে রাম গড়ের রাস্তাকে দুটি আংশে ভাগ করে রামগড় থেকে হেঁয়াকো দিলেন আমাকে। আর হেঁয়াকো থেকে করের হাট মেজর তালেবুল মাওলাকে। তিনি জানালেন যে যে জেনারেল মঞ্জুর সহ বিদ্রোহী অফিসারেরা পালাচ্ছে এবং তারা যেদিক দিয়ে এগুচ্ছে তাতে রামগড় থেকে করের হাটের মাঝামাঝি যে কোন জায়গা দিয়েই পালানোর চেষ্টা করবে। আমাদের কাজ হবে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আমাদের এলাকা দিয়ে কোন মানুষ রাস্তা পেরিয়ে ভারতের দিকে না চলে যেতে পারে। যে-ই যাবার চেষ্টা করবে তাকেই ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে এং সামান্যতম সন্দেহ হ'লে আটক করতে হবে। আর সে যদি আমাদের পরিচিত হয় তা'লে তো কথাই নেই। জীবনের প্রথম সৃষ্টিকর্তার কাছে কায়মনোবাক্যে একটি জিনিসই অন্তরের অন্তস্থল থেকে চাইলামঃ "হে ইচ্ছা পুরনকারী, আমার মনের একটি ইচ্ছে পুরণ করুন। কেঊ যেন আমার হাতে ধরা না পড়ে"। আমাদেরকে আদেশ দিয়ে তিনি আগে থেকে জড়ো হ'য়ে একদল বেসামরিক স্থানীয় লোকদেরকে সংঘবদ্ধ করতে লাগলেন- ৩/৪ জনের একেকটি দলে, যারা পায়ে চলাপথ যেগুলো বাংলাদেশের ভেতর থেকে ভারতে চলে গেছে সেগুলোতে পাহারা দেবে। কমান্ডারের এলাকাটা চষা ছিল, কারন শিকার করতে তিনি প্রায়ই এলাকাটিতে কাটাতেন। হেঁয়াকোতে ছিল একটি বি ডি আরএর বি ও পি (Border Out Post)। এমন অনেক জায়গা ছিল হেঁয়াকো থেকে রামগড় পর্যন্ত যেখানে রাস্তা পেরুলেই ৪/৫ ফুটের মধ্যে ১০/১২ ফুট চওড়া একটি অতি সরু খাল, খালটি পেরুলেই ভারত। টহল শুরু হ'ল। প্রথমেই আমার জীপ, তার পর ৭ টি Volvo ২ টন ট্রাক, তখনকার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে দামী state of the art military vehicle. হঠাৎ মনে পড়লো , জেনারেল মঞ্জুরই সিজিএস (Chief of the General Staff) থাকতে অনেক জোর জবরদস্তি করে জেনারেল জিয়াকে রাজী করিয়ে এই বাহনগুলো কিনেছিলেন। আজ তাকেই ধরতে এগুলো ব্যাবহার করা হচ্ছে। সন্ধ্যার কিছু আগে দিকে খবর এল জেনারেল মঞ্জুর আত্মসমর্পন করেছে ফটিকছড়িতে। আমার ও মেজর মাওলার ওয়্যারলেস ফ্রিকোয়েন্সী এক থাকায় এবং আমারা দু'জন বেশিরভাগ ওয়্যারলেস নিজেরাই অপারেট করার জন্যে সব খবরাখবর আদান প্রদান হচ্ছিল। আমার কুখ্যাত Weird Sense of Humour তখনো অল্প বিস্তর কাজ করছিল। দুজনেই কিছুক্ষন অদৃষ্টবাদী কথাবার্তা বলতে বলতে মনটাকে একটু চাংগা করলাম। হঠাৎ অপরপ্রান্ত থেকে কথা বন্ধ হ'য়ে গেল। আমি তখন অপারেটরকে ওয়্যারলেস সেটটা দিয়ে দিলাম। মিনিট পাঁচেক পর আমার অপারেটর জানালো যে মেজর রওশন ইয়াজদানী ভুঁইয়া বীর প্রতীক, মেজর মাওলার হেফাজতে । ভাগ্যের কি পরিহাস। মেজর মাওলা ক্যাপ্টেন থাকা আবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এই মেজর ইয়াজদানীর সরাসরি অধীনে GSO-III ছিলেন। যেহেতু মেজর তালেবুল মাওলা নিজে সে ঘটনা সম্পর্কে আমাকে কোনদিন কিছু বলেন নি, আমিও কিছু জিজ্ঞেস করিনি কখনো এবং যেহেতু মেজর ইয়াজদানীর হেফাজতে আসা নিয়ে একাধিক পরষ্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায় তাই আমি সে সম্পর্কে কিছু বলছি না। সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা আবার শুরু করলাম একই আর্জি নিয়ে। রাত বারটার কিছু আগে আমার চোখ ব্যাথা করতে লাগলো। প্রচন্ড শীতে আমি কাঁপতে লাগলাম। গাড়ীর বহর থামালাম মিনিট খানেকের জন্যে। মেডিক্যাল এসিট্যান্টকে ডেকে আনল রানার, জ্বর একশ চার। অনেকদিনের অভ্যাস জ্বর এলেই গোসল করা অনেকক্ষণ। কোথায় পাবো পানি? একবার ভাবলাম খালে নামি। কিন্তু অত সময় কোথায়? চারটা নোভালজিন মেরে দিয়ে পেটের ব্যাথায় মোচড়াতে মোচড়াতে টহল আবার শুরু করলাম। রাতের খাবার তখনো পৌছেনি. ঘড়িতে বাজে রাত বারোটা।

রবিবার, ৯ জুন, ২০১৩

আলেকজান্ডার

আলেকজান্ডার
শয্যা- সঙ্গী


মৃত্যু শয্যায় মহাবীর আলেকজান্ডার তার সেনাপতিদের ডেকে বলেছিলেন,'আমার মৃত্যুর পর আমার তিনটা ইচ্ছা তোমরা পূরণ করবে। আমার প্রথম অভিপ্রায় হচ্ছে,শুধু আমার চিকিৎসকরাই আমার কফিন বহন করবেন। আমার ২য় অভিপ্রায় হচ্ছে, আমার কফিন যে পথ দিয়ে গোরস্থানে যাবে সেই পথে আমার অর্জিত সোনা ও রুপা ছড়িয়ে থাকবে আর শেষ অভিপ্রায় হচ্ছে, কফিন বহনের সময় আমার দুইহাত কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে থাকবে।'
তার সেনাপতি তখন তাঁকে এই বিচিত্র অভিপ্রায় কেন করছেন প্রশ্ন করলেন। দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ করে আলেকজান্ডার বললেন, 'আমি দুনিয়ার সামনে তিনটি শিক্ষা রেখে যেতে চাই।

• আমার চিকিত্সকদের কফিন বহন করতে এই কারনে বলেছি যে যাতে লোকে অনুধাবন করতে পারে যে চিকিত্সকেরা কোন মানুষকে সারিয়ে তুলতে পারে না।তারা ক্ষমতাহীন আর মৃত্যুর থাবা থেকে রক্ষা করতে অক্ষম।'

• 'গোরস্হানের পথে সোনা- দানা ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা বো সোনা-দানার একটা কণাও আমার সঙ্গে যাবে না। এগুলো পাওয়ার জন্য সারাটা জীবন ব্যয় করেছি কিন্তু নিজের সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারছি না। মানুষ বুঝুক এসবের পেছনে ছোটা সময়ের অপচয়।'

• 'কফিনের বাইরে আমার হাত ছড়িয়ে রাখতে বলেছি মানুষকে এটা জানাতে পৃথিবীতে এসেছিলাম,আবার খালি হাতেই পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি. . . . .'।

জীবন ফুরাল নাকি

জীবন ফুরাল নাকি 
রুদ্র মুহাম্মদ শহীদউল্লা

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়
চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী
চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে
আমার না-থাকা জুড়ে।
জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!
বিদায়ের সেহনাই বাজে
নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে
সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে
এই যে বেঁচে ছিলাম
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়
সবাইকে
অজানা গন্তব্যে
হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি
অজান্তেই চমকে ওঠি
জীবন, ফুরালো নাকি!

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০১৩

ইভা ব্রাউন ; একনায়কের প্রেম

হিটলার ও ইভার প্রেমঃ


শয্যা- সঙ্গী


ইভার প্রতি হিটলারের অফুরন্ত ভালোবাসা ।
আর দশটি মানুষের মতো হিটলারেরও মন ও আবেগ ছিল। হয়তো ছিল ঘর বাঁধার স্বপ্নও। কিন্তু তার সাধ পূরণ হয়নি। ইভা ব্রাউনকে তিনি গভীরভাবে ভালোবাসতেন। সোভিয়েত সৈন্যরা এসে পৌঁছানোর আগে বার্লিনে ‘ফুয়েরার বাংকারে’ তারা দু’জন একসঙ্গে আত্মহত্যা করে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। পারিবারিক আপত্তি থাকায় তারা তাদের ১৭ বছরের অন্তরঙ্গ মুহূর্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেননি। তবে একসময় তারা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছিলেন যখন মৃত্যু ছিল তাদের কাছ থেকে মাত্র কয়েক ঘন্টা দূরে। কোঁকড়ানো চুলের ইভা দেখতে ছিলেন খুবই লাজুক।

হিটলার পরিশেষে জানতে পারল শত্রু বাহিনীর হাতে ঘেরাও হতে যাচ্ছেন । তবে হিটলার শত্রুদের হাতে ধরা দেবার মত লোক ছিলেন না, তার সিদ্ধান্ত আত্মহত্যা করবেন, নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিবেন, তবুও শত্রু পক্ষের হাতে ধরা দিবেন না ।

অবশেষে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে একটি বড়মাপের প্রেম ঝরে পড়ে। ইভা ব্রাউন হিটলারকে কতটুকু ভালোবাসতেন এবং তার প্রতি ইভার ধারণা কত উঁচু ছিল তা তার উক্তি থেকেই বুঝা যায়। ইভা মন্তব্য করতেন, যদি এমন হতো যে, ১০ হাজার লোকের জীবনের বিনিময়ে হিটলারকে রক্ষা করা সম্ভব তাহলে তাই হতো উত্তম। ভালোবাসা সত্যি অন্ধ! হিটলার তাকে সহমরণে যেতে নিষেধ করছিলেন। কিন্তু ইভা স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। ইচ্ছে করলে তিনি বেঁচে থাকতে পারতেন। হিটলারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তার জন্য একটি মূলধন। এ সম্পর্কের উপাখ্যান অবলম্বনে স্মৃতিচারণমূলক বই লিখে তিনি অঢেল অর্থোপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু ইভা এ সংকীর্ণতার পরিচয় দেননি। যেখানে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ হিটলারকে ঘৃণা করেছে, শত্রু ভেবেছে সেখানে তিনি তাকে ভেবেছেন হৃদয়ের একান্ত মানুষ হিসাবে। তিনি ছিলেন তার জীবনের শেষ ব্যক্তি।

বৃহস্পতিবার, ৬ জুন, ২০১৩

রামকেপালো

রামকেপালো

শয্যা- সঙ্গী





রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী
কেন এই প্রকল্প বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী?

রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে দুদেশের সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি নামে একটি কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অর্থায়ন করবে ১৫% পিডিবি, ১৫% ভারতীয় পক্ষ এবং ৭০% ঋণ নেওয়া হবে। যে নিট লাভ হবে সেটা ভাগ করা হবে ৫০% হারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পিডিবি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে।

কী সে ফর্মুলা? যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতিটন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে মাওয়া, খুলনার লবণচরা এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারায় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পিডিবির সঙ্গে, সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবণচড়া থেকে ৩ টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে। সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে পিডিবি এখান থেকে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবে সেটা নিশ্চিত।

এবার আসুন মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়। ১৮৩০ একর ধানী জমি অধিগ্রহণের ফলে ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ ৬০০ জনের, ফলে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। শুধু তাই নয়, আমরা প্রতি বছর হারাব কয়েক কোটি টাকার কৃষিজ উৎপাদন।

এবারে আসুন পরিবেশের ক্ষতির প্রশ্নে। কয়লাভিত্তিক যে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে অন্য যে কোনো প্রকল্পের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। বিশেষত ভষ্মিভূত কয়লার ছাই এবং উৎপন্ন গ্যাসের ফলে
বায়ু ও পানি দূষণের যুগপৎ প্রভাবের কারণে এই ক্ষতি হয়। এ ধরনের প্রকল্প এলাকার আশপাশের অঞ্চলে এসিডবৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে, যা বৃক্ষ এবং বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে ভয়ানক মাত্রায়।

যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ২০১০ সালে দেশটির মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৮১ ভাগ উদগীরণ করেছে কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলো, যা থেকে মোট শক্তির মাত্র ৪১ ভাগ পাওয়া গেছে। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাপী সকল দেশেই কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

সাম্প্রতিককালে এই ধরনের প্রকল্প এড়িয়ে চলার চেষ্টাটাই বেশি চোখে পড়ে। এ ধরনের কয়লাভিত্তিক প্রকল্প প্রতি ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রায় ২.২ বিলিয়ন গ্যালন পানির প্রয়োজন হয়। রামপালের প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে মেটানো হবে পশুর নদ থেকে। পশুর নদের পানি নোনা ও মিঠা জলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের প্রয়োজন মেটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই নদীটির সঙ্গে ওই গোটা অঞ্চলের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের সংযোগ রয়েছে। এটি ওই অঞ্চলের জনবসতির ক্ষেত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদ। কিন্তু এই প্রকল্প তৈরি করতে গিয়ে আমরা সেই নদের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে ফেলছি।

এই প্রকল্প এলাকা সুন্দরবনের ঘোষিত সংরক্ষিত ও স্পর্শকাতর অঞ্চল থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। অন্যান্য দেশে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫-২০ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় না। এমনকি এই ভারতীয় কোম্পানিকেও তার নিজের দেশেই এই যুক্তিতে মধ্য প্রদেশে একটি অনুরূপ প্রকল্প করতে দেওয়া হয়নি। ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে! আবার সুন্দরবন থেকে দূরত্ব আসলেই ১৪ কিলোমিটার কি না সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। খোদ ইআইএ রিপোর্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে প্রকল্পের স্থানটি একসময় সুন্দরবনেরই অংশ ছিল।

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট থাকবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণ করতে সাড়ে চার বছর সময় লাগবে। প্রথম ইউনিটটি নির্মাণের সাড়ে চার বছরের মধ্যে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদের উপর বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদীপথে পরিবহন করা হবে। ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নিঃসরণ ইত্যাদি সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে বলে ইআইএ রিপোর্টে আশংকা করা হয়েছে। ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর পানি ঘোলা হবে। ড্রেজিং সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তেল-গ্রিজ ইত্যাদি নিঃসৃত হয়ে নদীর পানি দূষিত হবে। পশুর নদের তীরবর্তী যে ম্যানগ্রোভ বনের সারি আছে তা কাটা পড়বে জেটি নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে। নদীতীরের ঝোপঝাড় কেটে ফেলার কারণে ঝোপঝাড়ের বিভিন্ন পাখি, বিশেষ করে সারস ও বকজাতীয় পাখির বসতি নষ্ট হবে। ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে বিদ্যুৎ কেন্দ্র অপারেশনে থাকা অবস্থায় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই-অক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। এছাড়াও পশুর নদ থেকে প্রতিঘণ্টায় ৯ হাজার ১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার করা হবে। যতই পরিশোধনের কথা বলা হোক, কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পানি নির্গমন হলে তাতে বিভিন্ন মাত্রায় দূষণকারী উপাদান থাকবেই যে কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেলায় ‘শূন্য নির্গমণ’ বা ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি অবলম্বন করা হয়। এনটিপিসিই যখন ভারতে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে, তখন ‘জিরো ডিসচার্জ’ নীতি অনুসরণ করেছে। অথচ ইআইএ রিপোর্টে বলা হয়েছে- রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিশোধন করার পর তরল বর্জ্য বা ইফ্লুয়েন্ট ঘন্টায় ১০০ ঘনমিটার হারে পশুর নদীতে নির্গত করা হবে, যা গোটা সুন্দরবন এলাকার পরিবেশ ধ্বংস করবে। ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে ২৭৫ মিটার উচু চিমনি থেকে নির্গত গ্যাসীয় বর্জ্যের তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে আশপাশের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু, যেমন- আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। কিন্তু আরও ভয়ংকর ব্যাপার হল, একদিকে বলা হয়েছে এই বিষাক্ত ছাই পরিবেশে নির্গত হলে ব্যাপক দূষণ হবে, অন্যদিকে এই ছাই দিয়েই প্রকল্পের মোট ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করার পরিকল্পনা করা হয়েছে! এই বর্জ্যছাইয়ের বিষাক্ত ভারী ধাতু নিশ্চিতভাবেই বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নিচের পানির স্তর দূষিত করবে। এর প্রভাব শুধু প্রকল্প এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদিত বর্জ্যছাই সিমেন্ট কারখানা, ইট তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও আসলে বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্যছাই কোনো সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহারের বদলে ছাইয়ের পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে গাদা করে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা উঠানো নামানো, পরিবহন ইত্যাদির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দদূষণ হয়। কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার, নাইট্রোজেন, কার্বন ইত্যাদির বিভিন্ন যৌগ কিংবা পারদ, সীসা, ক্যাডমিয়াম, ব্যারিয়াম ইত্যাদি ভারী ধাতুর দূষণ ছাড়াও কুলিং টাওয়ারে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণেও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আকারে নিউমোনিয়া জাতীয় রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে আমদানি করতে হবে। আমাদানিকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজের মাধ্যমে মংলা বন্দরে এনে তারপর সেখান থেকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সুন্দরবনের ভেতরে পশুর নদীর গভীরতা সর্বত্র বড় জাহাজের জন্য উপযুক্ত না হওয়ার কারণে প্রথমে বড় জাহাজে করে কয়লা সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে একাধিক ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা মংলাবন্দরে নিয়ে যেতে হবে। ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার টন কয়লা লাগবে। অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষে ২৬ হাজার টন কয়লা লাগবে। এর জন্য সুন্দর বনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ নদীপথে বড় জাহাজ বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিলোমিটার পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন হাজার হাজার টন কয়লা পরিবহন করতে হবে!

সরকারের পরিবেশ সমীক্ষাতেই স্বীকার করা হয়েছে, এভাবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ চলাচল করার ফলে কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লার গুড়া, ভাঙা বা টুকরো কয়লা, তেল, ময়লা-আবর্জনা, জাহাজের দূষিত পানিসহ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদী-খাল-মাটিসহ গোটা সুন্দরবন দূষিত করে ফেলবে। চলাচলকারী জাহাজের ঢেউয়ে দুপাশের তীরের ভূমিক্ষয় হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ও কয়লা লোড-আনলোড করার যন্ত্রপাতি থেকে দিনরাত ব্যাপক শব্দদূষণ হবে। রাতে জাহাজ চলাচলের সময় জাহাজের সার্চ লাইটের আলো নিশাচর প্রাণীসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পশুপাখির জীবনচক্রের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

এই ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির মধ্যপ্রদেশে প্রস্তাবিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে। তারা বলেছে, “বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রস্তাবিত স্থানটি কৃষিজমি, যা মোটেই প্রকল্পের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া নর্মদা নদী থেকে প্রকল্পের জন্য ৩২ কিউসেক পানি টেনে নেওয়া প্রকল্পের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। কৃষি জমির সল্পতা, নিকটবর্তী জনবসতি, পানির সল্পতা, পরিবেশগত প্রভাব এসব বিবেচনায় এই প্রকল্প বাতিল করা হল।”

যে বিবেচনায় এনটিপিসি নিজের দেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারেনি সেই একই বিবেচনায় বাংলাদেশে কী তাদের প্রকল্প বাতিল হতে পারে না?

প্রকল্পে ১৫% বিনিয়োগে ভারতীয় মালিকানা ৫০%।
বিদ্যুতের দাম পড়ছে দ্বিগুণেরও বেশি। উচ্ছেদ হচ্ছে ৭৫০০ পরিবার। কৃষিজ সম্পদ হারাচ্ছে দেশ। পরিবেশ বিপর্যয় হচ্ছে বাংলাদেশের। কিন্তু ৫০% শতাংশ মালিকানা ভারতীয় কোম্পানির? ভারত মধ্যপ্রদেশে যে প্রতিষ্ঠানকে কাজের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ সেই এনটিপিসিকেই সুন্দরবনের উপর ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ করে দিচ্ছে পরিবেশের উপর সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাব তোয়াক্কা না করেই। তার উপর ভারতীয় কোম্পানিকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র লাভের করও দিতে হবে না। এটা কীভাবে জাতীয় স্বার্থের অনুকুলে হয়? আর এটাই কী আমাদের গিলতে হবে?

রবিবার, ২ জুন, ২০১৩

কবিতা -রুদ্র

আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

আমার ভিতরে বাহিরে অন্তরে অন্তরে,
আছো তুমি হৃদয় জুড়ে।

ঢেকে রাখে যেমন কুসুম,
পাপড়ির আবডালে ফসলের ঘুম।
তেমনি তোমার নিবিঢ় চলা,
মরমের মূল পথ ধরে।

পুষে রাখে যেমন কুসুম,
খোলসের আবরণে মুক্তোর ঘুম।
তেমনি তোমার গভীর ছোঁয়া,
ভিতরের নীল বন্দরে।

ভাল আছি ভাল থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো।
দিয়ো তোমার মালাখানি,
বাউলের এই মনটারে।

আমার ভিতরে বাহিরে……